নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে উত্তাল রাজপথ: সারাদেশে তিন দিনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা
বাংলাদেশে সরকারি চাকুরেদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন এবং এর গেজেট প্রকাশের দাবিতে আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছে। বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সংগতি রেখে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আজ ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে সারাদেশে তিন দিনের নতুন কর্মসূচি শুরু করেছেন সরকারি কর্মচারীরা। দাবি আদায় না হলে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন অভিমুখে ‘ভুখা মিছিল’ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো।
আন্দোলনের মূল প্রেক্ষাপট
গত ২১ জানুয়ারি নবম জাতীয় বেতন কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিলেও এখন পর্যন্ত সরকার গেজেট প্রকাশ করেনি। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রতিবেদন জমা পড়ার পর সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে কালক্ষেপণ করছে। বিশেষ করে সরকারের একজন উপদেষ্টার সাম্প্রতিক মন্তব্য— “অন্তর্বর্তী সরকার পে-স্কেল বাস্তবায়ন করবে না”— সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছে।
ঘোষিত নতুন কর্মসূচি
‘বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ’ ও ‘সমন্বয় পরিষদ’ এর পক্ষ থেকে ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে:
-
৩ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি: প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ১১টা (কোথাও ১০টা থেকে ১২টা) পর্যন্ত দেশের সকল সরকারি দপ্তরে অবস্থান ধর্মঘট, বিক্ষোভ মিছিল ও কর্মবিরতি।
-
৬ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার): সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’ অভিমুখে গণমিছিল ও ঘেরাও কর্মসূচি।
পে-কমিশনের সুপারিশ বনাম কর্মচারীদের দাবি
কমিশন তাদের প্রতিবেদনে ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন বৈষম্য কমানোর প্রস্তাব করেছে। তবে আন্দোলনকারীরা ১২টি গ্রেডে বেতন বিন্যাসসহ বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন:
| খাতের নাম | বর্তমান কাঠামো (২০১৫) | আন্দোলনকারীদের দাবি | কমিশনের সুপারিশ (সম্ভাব্য) |
| সর্বনিম্ন মূল বেতন | ৮,২৫০ টাকা | ৩৫,০০০ টাকা | ২০,০০০ টাকা |
| সর্বোচ্চ মূল বেতন | ৭৮,০০০ টাকা | ১,৪০,০০০ টাকা | ১,৬০,০০০ টাকা |
| বেতন অনুপাত | ১:৯.৪৫ | ১:৪ (দাবি) | ১:৮ (প্রস্তাবিত) |
| অন্যান্য সুবিধা | – | রেশন পদ্ধতি ও শতভাগ পেনশন | স্বাস্থ্য বীমা ও টিফিন ভাতা বৃদ্ধি |
জনজীবনে প্রভাব ও সরকারি অবস্থান
টানা কর্মবিরতির ফলে গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেক জেলায় জরুরি সেবা ছাড়া প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন পে-স্কেল পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সরকারের বছরে প্রায় ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, সুপারিশগুলো পর্যালোচনার জন্য কমিটি কাজ করছে এবং তহবিল সংকুলান সাপেক্ষে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্দোলনকারীদের হুঁশিয়ারি
বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক বলেন, “গত ৭ বছর ধরে আমরা ধৈর্য ধরেছি। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই বেতন দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব। সরকার যদি আমাদের পেটের ক্ষুধা না বোঝে, তবে রাজপথ ছাড়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।”
বিশ্লেষণ: নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে কর্মচারীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, অন্যদিকে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশাল অংকের এই অতিরিক্ত ব্যয়ভার বহন করা সরকারের জন্য কঠিন। আগামী ৬ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

