ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ

প্রযুক্তির যুগেও কেন অপরিহার্য চেকের পেছনের ‘দুই তালা’ নিরাপত্তা?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ওটিপি (OTP), এবং বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশনের এই যুগে ব্যাংকিং খাতের চেহারা অনেকটাই বদলে গেছে। মোবাইল স্ক্রিনের এক ক্লিকেই এখন লাখ লাখ টাকা লেনদেন হচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও ব্যাংকের কাউন্টারে নগদ টাকা উত্তোলনের ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম ‘চেক’ এবং এর পেছনে দুটি স্বাক্ষর নেওয়ার নিয়মটি তার কার্যকারিতা ও গুরুত্ব হারায়নি। অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের মতে, এই দুটি স্বাক্ষর আসলে ব্যাংকিং নিরাপত্তার এমন দুটি ‘তালা’, যা শত বছরের পুরনো হলেও আজও জালিয়াতি রোধে সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করছে।

দুটি স্বাক্ষরের ভিন্ন দুটি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থ

সাধারণ গ্রাহকদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে—চেকের সামনে অ্যাকাউন্টধারীর স্বাক্ষর থাকার পরও পেছনে কেন আবার দুবার স্বাক্ষর করতে হয়? ব্যাংকিং আইন ও কার্যপদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দুটি স্বাক্ষরের প্রতিটির রয়েছে আলাদা এবং সুনির্দিষ্ট অর্থ:

  • প্রথম স্বাক্ষর (Endorsement বা পৃষ্ঠাঙ্কন): চেকের পেছনের প্রথম স্বাক্ষরটির আইনি অর্থ হলো ‘পৃষ্ঠাঙ্কন’। এর মাধ্যমে চেকে উল্লেখিত ব্যক্তি বা বাহক প্রত্যয়ন করেন যে, তিনিই এই চেকের প্রকৃত দাবিদার এবং চেকে বর্ণিত অর্থ উত্তোলনের বৈধ অধিকার তার রয়েছে।

  • দ্বিতীয় স্বাক্ষর (Receipt বা প্রাপ্তি স্বীকার): দ্বিতীয় স্বাক্ষরটি মূলত একটি রসিদ বা ‘টাকা বুঝে পাওয়ার স্বীকৃতি’। গ্রাহক যখন ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড়ান, তখন ক্যাশ অফিসার গ্রাহকের উপস্থিতিতেই এই স্বাক্ষরটি নিয়ে থাকেন। এর অর্থ হলো—গ্রাহক নগদ অর্থটি ব্যাংকের কাছ থেকে স্বশরীরে এবং সম্পূর্ণ বুঝে পেয়েছেন। পরবর্তীতে কেউ যদি দাবি করেন যে তিনি টাকা পাননি, তখন এই দ্বিতীয় স্বাক্ষরটি আদালতে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।


জালিয়াতি রোধে মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত দেওয়াল

অনলাইন জালিয়াতি বা হ্যাকিংয়ের চেয়ে কাগজের চেকে জালিয়াতির ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন দক্ষ জালিয়াত হয়তো ঘরে বসে নিখুঁতভাবে কোনো গ্রাহকের স্বাক্ষর নকল করে চেকে বসিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ব্যাংকের ক্যাশ অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে হুবহু সেই একই স্বাক্ষর করা মনস্তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত কঠিন।

অভিজ্ঞ ক্যাশ অফিসাররা জানান, গ্রাহককে সামনে দাঁড় করিয়ে যখন আবার স্বাক্ষর করতে বলা হয়, তখন জালিয়াতদের হাতের লেখার জড়তা, কলমের চাপ, লেখার গতি এবং শারীরিক হাবেভাবে পরিবর্তন আসে, যা খুব সহজেই ধরা পড়ে যায়। ফলে এই প্রক্রিয়াটি একই সাথে মনস্তাত্ত্বিক ও বাহ্যিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে।


ডিজিটাল যুগেও কেন এই ‘শর্টকাটহীন’ নিরাপত্তা?

বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সিগনেচার ভেরিফিকেশন সফটওয়্যার বা অনলাইন ডাটাবেজ রয়েছে। তবুও চেকের পেছনে এই সনাতন নিয়মের ওপর নির্ভর করার মূল কারণ—“ব্যাংকিংয়ে নিরাপত্তার কোনো শর্টকাট নেই।”

বিশেষ করে ‘বেয়ারার চেক’ বা বাহক চেকের ক্ষেত্রে, যেখানে অ্যাকাউন্টধারী নিজে না এসে অন্য কাউকে টাকা তোলার জন্য পাঠান, সেখানে এই দুই স্বাক্ষর ছাড়া ব্যাংকের পক্ষে লেনদেনের সত্যতা নিশ্চিত করা অসম্ভব। এটি একদিকে যেমন গ্রাহকের আমানত রক্ষা করে, অন্যদিকে ব্যাংককেও আইনি জটিলতা ও আর্থিক ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখে।


পরিশেষ: প্রযুক্তির চাকা যত দ্রুতই ঘুরুক না কেন, ব্যাংকিং খাতের মূল ভিত্তি হলো ‘আস্থা’ এবং ‘নিরাপত্তা’। চেকের পেছনের দুটি স্বাক্ষর কেবল কলমের কালি নয়; এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক নির্ভরযোগ্য “সেফটি ভালভ”। যুগের পরিবর্তনেও এই ছোট নিয়মটি ব্যাংকের কোটি কোটি টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চলেছে নিঃশব্দে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *