Latest News

উৎসবের আড়ালে দীর্ঘশ্বাস: গ্রেড বৈষম্যের যাঁতাকলে ১১-২০ গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের কোরবানি সংকট

বাঙালি সমাজে ‘সরকারি চাকরি’ মানেই এক বিশাল সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার প্রতীক। গ্রাম কিংবা শহর—সবখানেই সরকারি চাকরিজীবীদের এক আলাদা চোখে দেখা হয়। কিন্তু এই চাকচিক্যময় পরিচয়ের আড়ালে যে কত বড় অর্থনৈতিক হীনমন্যতা ও মানসিক যন্ত্রণা লুকিয়ে থাকে, তা প্রতিবছর ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদ এলে অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রকাশ পায়। বিশেষ করে জাতীয় বেতন স্কেলের ১১ থেকে ২০ তম গ্রেডের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এই বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত করুণ।

চলতি বছরের জুলাই মাসের বেসিক (মূল বেতন) অনুযায়ী পবিত্র ঈদুল আযহার উৎসব ভাতা বা বোনাস পাওয়ার পরও বিশাল এক অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন নিম্নধাপের এই কর্মচারীরা। তীব্র ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কেবল আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে অনেকেই কোরবানি দিতে পারছেন না। অথচ সামাজিক মর্যাদার কারণে সমাজে মুখ দেখানোটাই এখন তাদের জন্য বড় দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোরবানি না দিলে প্রতিবেশীদের কানাঘুষা ও সামাজিক হেয় প্রতিপন্নের শিকার হতে হয়, আর কোরবানি দিতে গেলে পড়তে হয় বিশাল ঋণের মুখে।

বোনাস যখন নামমাত্র: উৎসবের আনন্দ বনাম সামাজিক লজ্জা

২০২৬ সালের ঈদুল আযহা উপলক্ষে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীরা যে উৎসব ভাতা পেয়েছেন, তা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। উদাহরণস্বরূপ, ২০ গ্রেডের একজন অফিস সহায়ক যার চাকরির বয়স মাত্র ২ বছর, তিনি বোনাস পেয়েছেন মাত্র ৮,৬৭০ টাকা। বর্তমান বাজারে যেখানে একটি মাঝারি আকারের কোরবানির গরুর ভাগের মূল্য বা একটি ছাগলের দামই ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, সেখানে এই ৮,৬৭০ টাকা দিয়ে কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা, পরিবারের সাধারণ কেনাকাটা করাই অসম্ভব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০ গ্রেডের একজন অফিস সহায়ক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি চাকরি করি শুনে সবাই ভাবে কত টাকা! কোরবানি না দিলে সমাজের ১০ জন মানুষ নানা কথা শোনায়। কিন্তু কেউ তো জানে না যে, ৮,৬৭০ টাকা বোনাস পেয়ে তা দিয়ে স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য ঈদের কাপড়-চোপড় এবং ঈদ সামগ্রী কিনব, নাকি কোরবানির হাটে যাব? এই বোনাস আমাদের আনন্দ দেয় না, বরং একরাশ টেনশন আর মানসিক লজ্জা উপহার দেয়।”

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫: বৈষম্যের মূল উৎস

কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে এই আকাশচুম্বী ব্যবধানের পেছনে মূল কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে বর্তমান ‘জাতীয় পে স্কেল-২০১৫’। এই বেতন স্কেলটিকে অত্যন্ত বৈষম্যমূলক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষকেরা।

  • ১১-২০ তম গ্রেড (কর্মচারী): প্রতিটি স্কেলের ধাপের মধ্যকার ব্যবধান বা দূরত্ব গড়ে মাত্র ৪%

  • ১-১০ তম গ্রেড (কর্মকর্তা): প্রতিটি স্কেলের ধাপের মধ্যকার ব্যবধান বা দূরত্ব গড়ে প্রায় ২০%

আমাদের বর্তমান পে স্কেলে মোট ২০টি গ্রেড রয়েছে। যেখানে সর্বনিম্ন গ্রেডে (২০ তম গ্রেড) প্রারম্ভিক মূল বেতন ধরা হয়েছে ৮,২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে (১ম গ্রেড) বেতন নির্ধারিত ৭৮,০০০ টাকা। সে হিসাবে এই পে স্কেলের অনুপাত দাঁড়ায় প্রায় ১:১০। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও আদর্শ মানদণ্ড অনুযায়ী কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতনের অনুপাত হওয়া উচিত ১:৪

পরিসংখ্যানে বৈষম্যের বাস্তব চিত্র: কর্মকর্তা বনাম কর্মচারী বোনাস ২০২৬

একই দপ্তরে পাশাপাশি কাজ করেও শুধুমাত্র গ্রেডের পার্থক্যের কারণে বোনাস এবং উৎসব উদযাপনে কীরূপ আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা প্রাপ্ত তথ্যের সারণী লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

সারণী ১: কর্মচারীদের বোনাস কাঠামো (১১-২০ গ্রেড) – ২০২৬

গ্রেড পদবি চাকরির বয়স প্রাপ্ত উৎসব বোনাস (টাকা)
২০ তম অফিস সহায়ক ২ বছর ৮,৬৭০/-
১৯ তম গার্ড ২০ বছর ১৪,৬০০/-
১৭ তম নিরাপত্তা প্রহরী ৩০ বছর ১৭,৯২০/-
১৬ তম অফিস সহকারী ৫ বছর ১১,৩২০/-
১৪ তম হিসাব রক্ষক ৭ বছর ১৩,৭১০/-
১৩ তম প্রধান সহকারী ৩৩ বছর ২১,৮৬০/-
১১ তম সুপারভাইজার ২৭ বছর ২৪,৮৫০/-

সারণী ২: কর্মকর্তাদের বোনাস কাঠামো (১-৯ গ্রেড) – ২০২৬ (উৎসব ভাতা ২০২৫-২৬ এর হিসাব অনুযায়ী)

গ্রেড পদবি/মর্যাদা চাকরির বয়স প্রাপ্ত উৎসব বোনাস (টাকা)
৯ম গ্রেড কর্মকর্তা ৩ বছর ২৬,৭৬০/-
৮ম গ্রেড কর্মকর্তা ১৫ বছর ৩৯,৩৯০/-
ষ্ঠ গ্রেড কর্মকর্তা ৩২ বছর ৪৯,৯৮০/-
৫ম গ্রেড কর্মকর্তা ৫ বছর ৬১,icon০/- (৬১,২০০/-)
৪র্থ গ্রেড কর্মকর্তা ৩১ বছর ৭১,২০০/-

একই সমাজ, দুটি ভিন্ন বাস্তবতা

উপরোক্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন কর্মচারী এই ঈদে সর্বনিম্ন ৮,৬৭০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২৪,৮৫০ টাকা বোনাস পেয়েছেন। অন্যদিকে, ৯ম থেকে ৪র্থ গ্রেডের একজন কর্মকর্তা সর্বনিম্ন ২৬,৭৬০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭১,২০০ টাকা পর্যন্ত বোনাস পেয়েছেন।

এই বৈষম্যের কারণে কর্মকর্তাদের পক্ষে খুব সহজেই ১৫-২০ হাজার টাকা দিয়ে কোরবানির শেয়ার কিনে, পরিবারের সবার জন্য নতুন পোশাক ক্রয় এবং আত্মীয়-স্বজনদের আপ্যায়ন করেও বেশ কিছু টাকা সঞ্চয় বা সেভিং করা সম্ভব হচ্ছে। তাদের পরিবারে ঈদ আসছে প্রকৃত অর্থেই আত্মতৃপ্তি আর খুশি নিয়ে।

ঠিক বিপরীত চিত্রে, নিম্নধাপের কর্মচারীরা পড়েছেন চরম হীনমন্যতায়। যদি তারা ১৫-২০ হাজার টাকা খরচ করে কোরবানিতে শরিক হন, তবে বোনাসের পুরো টাকা শেষ হয়ে উল্টো ঋণের বোঝা মাথায় চাপবে। ফলস্বরূপ, সন্তানের জন্য নতুন জামা কেনা কিংবা ঈদের দিন ভালো একটু খাবারের আয়োজন করার সামর্থ্য তাদের থাকে না। এই পৈশাচিক বৃত্তে পড়ে নিম্ন আয়ের এই বিশাল সরকারি কর্মচারী গোষ্ঠী না পারছে সমাজ রক্ষার্থে কোরবানি দেওয়া থেকে পিছু হটতে, না পারছে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। এটি যেন কর্মচারীদের জন্য খুশির বদলে একরাশ টেনশন বয়ে আনে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন ও আশু সমাধান

কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে মেধা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পদের কারণে বেতনের ব্যবধান থাকাটা স্বাভাবিক। তবে সেই ব্যবধান যখন অমানবিক ও বৈষম্যমূলক পর্যায়ে চলে যায়, তখন তা সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য বর্তমান পে স্কেলটি সংশোধন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

বেতনের অনুপাত যদি বর্তমান ১:১০ এর পরিবর্তে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১:৪ এ নামিয়ে আনা যায় এবং প্রতিটি গ্রেডের মধ্যকার গ্যাপ বা দূরত্ব সমান হারে পুনর্বিন্যাস করা হয়, তবেই কেবল ১১-২০ তম গ্রেডের কর্মচারীদের এই দীর্ঘশ্বাস বন্ধ হবে। আমলাতান্ত্রিক এই জটিল জট কেবল সরকার প্রধানের সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। ঈদ বোনাসের নামে এই লজ্জাজনক পরিস্থিতি থেকে কর্মচারীদের মুক্তি দিতে এবং তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু শান্তিতে ঈদ উদযাপনের সুযোগ করে দিতে বর্তমান সরকারের আশু পদক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী লাখো সরকারি কর্মচারী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *