অন্যের দেওয়া চেকে টাকা লেনদেন: চেক ডিজঅনার মামলা কি করা যাবে? জানুন আইনি সমাধান
ব্যবসায়িক লেনদেন কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ধারের টাকা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ‘চেক’ একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, আপনি যাকে টাকা দিচ্ছেন, সে নিজের চেক না দিয়ে অন্য কোনো ব্যক্তির (তৃতীয় পক্ষ) স্বাক্ষর করা চেক আপনাকে ধরিয়ে দিচ্ছে। পরবর্তীতে সেই চেকটি ডিজঅনার বা প্রত্যাখ্যাত হলে বিপাকে পড়েন টাকা দাতা।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চেকের মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিলতা নিয়ে সাধারণ মানুষের নানামুখী মন্তব্য দেখা গেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন— “আমি একজনকে টাকা দিয়েছি, কিন্তু সে নিজের চেক না দিয়ে অন্য আরেকজনের থেকে পাওয়া চেক আমাকে দিয়েছে। এখন চেকটি ডিজঅনার হলে আমি কার বিরুদ্ধে মামলা করব? মামলা কি আদেও করা যাবে?”
আইনজীবী ও আইনি বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং ‘হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১’ (Negotiable Instruments Act) অনুযায়ী এই বিষয়ের খুঁটিনাটি ও আইনি সমাধান নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
তৃতীয় পক্ষের চেকে মামলা করা যাবে কি?
হ্যাঁ, অবশ্যই মামলা করা যাবে। আইন অনুযায়ী, চেকের মূল মালিক (যিনি চেকে স্বাক্ষর করেছেন) তার অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকা সত্ত্বেও চেকটি ইস্যু করার কারণে অপরাধ করেছেন। তবে এখানে মামলার ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন আইনি পথ রয়েছে, যা আপনার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
১. হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ১৩৮ ধারা (চেক ডিজঅনার মামলা)
আপনি যাকে টাকা দিয়েছেন, সে যদি অন্য কোনো ব্যক্তির স্বাক্ষর করা সম্পূর্ণ ‘ব্লাংক চেক’ বা আপনার নাম উল্লেখ করা চেক আপনাকে দেয়, এবং সেটি ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর ‘পর্যাপ্ত তহবিল নেই’ (Insufficient Funds) কারণে ডিজঅনার হয়, তবে আপনি চেকের মূল স্বাক্ষরকারীর (অ্যাকাউন্ট হোল্ডার) বিরুদ্ধে ১৩৮ ধারায় মামলা করতে পারবেন।
আইনি যুক্তি: চেকে যার স্বাক্ষর থাকে, ব্যাংকের কাছে এবং আইনের চোখে তিনিই দায়বদ্ধ। তিনি কেন অন্যকে চেক দিলেন বা সেই চেক আপনার হাতে কীভাবে এলো, তা আদালতে প্রমাণের বিষয়। তবে চেকের মেয়াদ (ইস্যুর তারিখ থেকে ৬ মাস) থাকা অবস্থায় তা ব্যাংকে জমা দিতে হবে এবং ডিজঅনার হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হবে।
২. দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা (প্রতারণার মামলা)
আপনি সরাসরি যাকে টাকা দিয়েছেন (দ্বিতীয় পক্ষ), তিনি যদি আপনাকে ঠকানোর উদ্দেশ্যে বা জেনেশুনে এমন একজনের চেক দেয় যার অ্যাকাউন্টে টাকা নেই, তবে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার মামলা করা যাবে। এক্ষেত্রে যিনি টাকা নিয়েছেন এবং যিনি চেক দিয়েছেন—উভয়কেই আসামি করা সম্ভব।
কার বিরুদ্ধে মামলা করবেন: টাকা গ্রহণকারী নাকি চেকের মালিক?
বাস্তব ক্ষেত্রে এই ধরণের জটিলতায় মামলার কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনজীবীদের মতে, নিরাপদ ও কার্যকরী পদক্ষেপ হলো:
-
যুগ্ম আসামি করা: আপনি যদি ফৌজদারি আদালতে প্রতারণার (৪২০ ধারা) মামলা করেন, তবে যিনি আপনার থেকে টাকা নিয়েছেন এবং চেকে যিনি স্বাক্ষর করেছেন—উভয়কে আসামি করাই শ্রেয়। এতে আদালত তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করতে পারে।
-
শুধু চেকের মালিকের বিরুদ্ধে: আপনি যদি দ্রুত শুধু টাকার জন্য চাপ দিতে চান, তবে ১৩৮ ধারায় চেকের মূল মালিকের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে মামলা করতে পারেন। তখন চেকের মালিক নিজেকে বাঁচাতে বাধ্য হয়ে ওই মধ্যস্থতাকারীকে (যাকে তিনি চেক দিয়েছিলেন) আদালতে টেনে আনবেন।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও বাস্তব চিত্র
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই চেকের মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, “চেকের মামলা করা মানে আইনজীবীদের পেট ভরানো, মামলা শেষ হতে ৪-৫ বছর লেগে যায়।” আবার কেউ মন্তব্য করেছেন, “আসামি টাকা না দিয়ে ১ বছর জেল খাটলে বাদীর পকেট থেকে শুধু টাকাই খরচ হয়।”
বাস্তবতা কী? আইনজ্ঞদের মতে, চেকের মামলা কিছুটা সময়সাপেক্ষ হলেও এটি একটি শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার। কারণ:
-
আদালতের রায়ে আসামির অনধিক ১ বছর কারাদণ্ড এবং চেকের টাকার সর্বোচ্চ ৩ গুণ পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
-
আসামি যদি নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে চান, তবে চেকে উল্লেখিত টাকার নূন্যতম ৫০% টাকা আদালতে জমা দিয়ে আপিল করতে হয়। ফলে বাদী শুরুতেই কিছু টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ পান।
ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি পরামর্শ ও সতর্কতা
অন্যের চেক বা যেকোনো চেকে টাকা লেনদেনের সময় আইনি জটিলতা এড়াতে নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই মাথায় রাখুন:
-
লিখিত চুক্তি (Deed): শুধু চেকের ওপর ভরসা না করে, যার সাথে টাকার লেনদেন হচ্ছে তার সাথে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি স্পষ্ট চুক্তিপত্র সই করিয়ে নিন। সেখানে উল্লেখ থাকবে যে, তিনি অমুকের চেকটি গ্যারান্টি হিসেবে আপনাকে দিচ্ছেন।
-
চেকের পেছনে স্বাক্ষর: তৃতীয় পক্ষের চেক নেওয়ার সময়, যিনি আপনাকে চেকটি দিচ্ছেন, তার নিজের স্বাক্ষর চেকের অপর পিঠে (পেছনে) করিয়ে নেওয়া ভালো। এতে প্রমাণিত হয় যে চেকটি তার হাত হয়ে আপনার কাছে এসেছে।
-
সময়সীমা ঠিক রাখা: চেক ডিজঅনার হওয়ার পর আবেগের বশে সময় নষ্ট না করে, অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে ৩০ দিনের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ নিশ্চিত করুন। সময় পার হয়ে গেলে ১৩৮ ধারার বিশেষ সুবিধা আর পাওয়া যায় না।
উপসংহার: পরের চেক দিয়ে টাকা ধার নিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ আইনে নেই। সঠিক সময়ে সঠিক আইনি পদক্ষেপ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র (মূল চেক, ডিজঅনার স্লিপ, নোটিশের কপি) থাকলে আদালত থেকে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। তবে যেকোনো বড় লেনদেনের আগে মৌখিক কথার চেয়ে লিখিত চুক্তি করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

