দেশের বাজারে আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম: ভরি ২ লাখ ৬১ হাজার টাকা ছাড়াল
দেশের বাজারে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে স্বর্ণের দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) থেকে কার্যকর হওয়া নতুন এই মূল্য তালিকা প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা ও স্থানীয় বাজারে ‘তেজাবি স্বর্ণের’ (পিওর গোল্ড) মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
নতুন মূল্য তালিকা একনজরে
বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের নতুন দাম নিচে দেওয়া হলো:
| স্বর্ণের মান (ক্যারট) | নতুন দাম (ভরি প্রতি) | আগের দামের তুলনায় পরিবর্তন |
| ২২ ক্যারট | ২,৬১,০৪০ টাকা | ২,২১৬ টাকা (বৃদ্ধি) |
| ২১ ক্যারট | ২,৪৯,১৪৩ টাকা | ২,১০০ টাকা (বৃদ্ধি) |
| ১৮ ক্যারট | ২,১৩,৫৬৮ টাকা | ১,৮০৮ টাকা (বৃদ্ধি) |
| সনাতন পদ্ধতি | ১,৭৪,৭৮৫ টাকা | ১,৪৫৮ টাকা (বৃদ্ধি) |
দ্রষ্টব্য: স্বর্ণের এই মূল্যের সাথে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৫% ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬% মজুরি (মেকিং চার্জ) যোগ হবে। গয়নার ডিজাইন ভেদে মজুরি কমবেশি হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষণের প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য যে, মাত্র এক দিন আগে ৮ ফেব্রুয়ারি স্বর্ণের দাম ভরিতে ৩,২৬৬ টাকা কমানো হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববাজারে গোল্ড স্পট প্রাইস বৃদ্ধি এবং দেশের স্থানীয় বুলিয়ন মার্কেটে কাঁচা স্বর্ণের সরবরাহ সংকটের কারণে বাজুস জরুরি সভা ডেকে ফের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়।
চলতি ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশ সময়ই দাম বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন স্বর্ণকে একটি ‘নিরাপদ সম্পদ’ (Safe Haven Asset) হিসেবে বিবেচনা করায় বাজারে এর চাহিদাও ঊর্ধ্বমুখী।
রুপার বাজার অপরিবর্তিত
স্বর্ণের দাম বাড়লেও রুপার দামে বর্তমানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ক্যাটাগরি অনুযায়ী রুপার দাম পূর্বের মতোই স্থির রয়েছে:
২২ ক্যারট রুপা: ১,৫৭৫ টাকা (ভরি)
২১ ক্যারট রুপা: ১,৫০৫ টাকা (ভরি)
১৮ ক্যারট রুপা: ১,২৮৩ টাকা (ভরি)
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ স্বর্ণের বাজারে এই অস্থিরতা বজায় থাকতে পারে। ক্রেতাদের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে গয়না ক্রয়ের পরামর্শ দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

স্বর্ণের দামে এত চালামাটাল কেন?
স্বর্ণের বাজারে এই অস্থিরতা বা ‘চলাফেরা’ দেখে আপনার অবাক হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। বিশেষ করে ২০২৬ সালের শুরুতে যেভাবে এক দিনে ৫-৭ হাজার টাকা বাড়ছে বা কমছে, তা সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদেরও বেশ বিভ্রান্তিতে ফেলেছে।
স্বর্ণের দাম এত চালামাটাল হওয়ার প্রধান কারণগুলো নিচে সহজভাবে ব্যাখ্যা করছি:
১. আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা (Global Factors)
স্বর্ণ কোনো স্থানীয় পণ্য নয়, এটি আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত।
ডলারের মান: আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ কেনাবেচা হয় ডলারে। ডলার দুর্বল হলে স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়।
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: ইউক্রেন-রাশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো ঘটনা ঘটলে মানুষ টাকা বা শেয়ারের চেয়ে স্বর্ণকে বেশি ‘নিরাপদ’ মনে করে (Safe Haven Asset)। সবাই যখন একসাথে স্বর্ণ কিনতে ঝোঁকে, তখন বিশ্ববাজারে এর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে।
২. বিনিয়োগের প্রবণতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক (Central Banks)
বিশ্বের বড় বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো (যেমন: চীন, ভারত, তুরস্ক) এখন নিজেদের রিজার্ভে ডলার কমিয়ে স্বর্ণ বাড়াচ্ছে। বিশাল পরিমাণ স্বর্ণ যখন বাজারে কেনা হয়, তখন সরবরাহ কমে যায় এবং দাম বেড়ে যায়। এছাড়া বড় বিনিয়োগকারীরা এখন শেয়ার বাজারের চেয়ে স্বর্ণে বিনিয়োগ করাকে লাভজনক মনে করছেন।
৩. দেশের বাজারে ‘তেজাবি স্বর্ণের’ সংকট
বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘তেজাবি স্বর্ণ’ বা পাকা স্বর্ণের (Pure Gold) দাম সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
স্থানীয় বুলিয়ন মার্কেটে যদি কাঁচা স্বর্ণের যোগান কমে যায়, তবে এর দাম বেড়ে যায়।
যেহেতু বাংলাদেশ স্বর্ণ আমদানিতে অনেকটা পিছিয়ে (বেশিরভাগই রিসাইকেল বা ব্যাগেজ রুলের মাধ্যমে আসে), তাই বাজারে একটু সংকট হলেই দাম অনেক বেড়ে যায়।
৪. মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্ত
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (Fed) যদি সুদের হার কমায়, তবে বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের দাম বাড়ে। ২০২৬ সালের জন্য পূর্বাভাস আছে যে তারা সুদের হার কয়েক দফায় কমাতে পারে, যার আগাম প্রভাবে বাজারে অস্থিরতা চলছে।
৫. বাজুসের (BAJUS) ঘনঘন সমন্বয়
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। বিশ্ববাজারে বা স্থানীয় বাজারে সামান্য পরিবর্তন এলেই তারা সেটা সমন্বয় করছে। এক বছর আগেও হয়তো মাসে ১-২ বার দাম পরিবর্তন হতো, এখন সপ্তাহে ২-৩ বারও হতে দেখা যাচ্ছে।

