জিপিএফে ১৩% লাভ পেলেন না কেন? অর্থবছরভিত্তিক সুদ গণনার নিয়ম নিয়ে বিভ্রান্তি, যা জানা জরুরি
সরকারি চাকরিজীবীদের সাধারণ ভবিষ্য তহবিল (GPF) হিসাবের লাভ বা সুদ নিয়ে প্রতি অর্থবছর শেষে অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি দেখা যায়। বিশেষ করে সরকার ঘোষিত ১৩ শতাংশ সুদের হার থাকলেও অনেকেই হিসাব মিলিয়ে দেখেন যে প্রকৃত প্রাপ্ত লাভ ১৩ শতাংশের চেয়ে কম হয়েছে। সম্প্রতি একজন সরকারি কর্মচারীর জিপিএফ হিসাবকে কেন্দ্র করে এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে, যা নিয়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞ ব্যক্তি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
যে হিসাবটি নিয়ে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর তথ্য অনুযায়ী—
২০২৪-২৫ অর্থবছর
- জমাকৃত অর্থ: ৯,৬০০ টাকা
- প্রদেয় লাভ: ২৬০ টাকা
- ওপেনিং ব্যালান্স: ৯,৮৬০ টাকা
২০২৫-২৬ অর্থবছর
- পূর্বের ওপেনিং ব্যালান্স: ৯,৮৬০ টাকা
- চলতি বছরে মোট জমা: ২৯,৯০০ টাকা
- প্রদেয় লাভ: ৩,৩২৭.১২ টাকা
- মোট ব্যালান্স: ৪৩,০৮৭ টাকা
এ হিসাব দেখে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর প্রশ্ন ছিল—যদি ১৩ শতাংশ হারে লাভ প্রদান করা হয়ে থাকে, তাহলে লাভের পরিমাণ আরও বেশি হওয়ার কথা ছিল কি না।
কেন পুরো জমার ওপর ১৩ শতাংশ সুদ পাওয়া যায় না?
জিপিএফের সুদ গণনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পূর্ববর্তী অর্থবছরের সমাপনী স্থিতি (Opening Balance) এবং চলতি অর্থবছরে মাসভিত্তিক জমাকৃত অর্থ একইভাবে সুদ পায় না।
সাধারণভাবে হিসাবের নিয়ম হলো—
- আগের অর্থবছরের সমাপনী স্থিতির ওপর সরকার ঘোষিত পূর্ণ বার্ষিক সুদের হার (যেমন ১৩%) প্রযোজ্য হয়।
- কিন্তু চলতি অর্থবছরে প্রতি মাসে যে অর্থ জমা হয়, তা পুরো ১২ মাস ব্যাংকে বা তহবিলে থাকে না। ফলে প্রতিটি কিস্তি জমার সময় অনুযায়ী আনুপাতিক হারে সুদ গণনা করা হয়।
- এজন্য চলতি বছরের জমার ওপর কার্যকর সুদের হার গড়ে প্রায় ৬.৫ থেকে ৭ শতাংশের কিছু বেশি হয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা
এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতে, অনেকেই ভুল করে ধারণা করেন যে বছরের মোট জমাকৃত অর্থের ওপর একসঙ্গে ১৩ শতাংশ সুদ পাওয়া উচিত। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী—
- পূর্ববর্তী বছরের স্থিতির ওপর ১৩ শতাংশ হারে পূর্ণ সুদ প্রদান করা হয়।
- চলতি বছরের মাসিক জমার ওপর জমার সময়কাল অনুযায়ী আনুপাতিক সুদ যোগ হয়।
- ফলে পুরো বছরের মোট লাভ ১৩ শতাংশের সমান হয় না।
আরও অনেকে উল্লেখ করেন, প্রতি মাসে আলাদাভাবে জমা হওয়া অর্থের প্রতিটি কিস্তি সমান সময় তহবিলে থাকে না। তাই বছরের শেষ মাসে জমা দেওয়া অর্থ মাত্র কয়েক দিনের জন্য সুদ পাওয়ার সুযোগ পায়, যেখানে প্রথম মাসের জমা প্রায় পুরো বছরের সুদ পায়।
আপনার হিসাবে কতটা যৌক্তিক?
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী—
- পূর্বের স্থিতি ৯,৮৬০ টাকার ওপর ১৩ শতাংশ সুদ প্রায় ১,২৮১.৮০ টাকা হওয়ার কথা।
- চলতি বছরে জমাকৃত ২৯,৯০০ টাকার ওপর মাসভিত্তিক আনুপাতিক সুদ যোগ হয়ে মোট প্রদেয় লাভ দাঁড়িয়েছে ৩,৩২৭.১২ টাকা।
অর্থাৎ প্রদেয় লাভের একটি অংশ এসেছে আগের বছরের স্থিতির পূর্ণ সুদ থেকে এবং বাকি অংশ এসেছে চলতি বছরের মাসিক জমার আনুপাতিক সুদ হিসেবে। ফলে মোট লাভের পরিমাণ জিপিএফের প্রচলিত সুদ গণনার নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য পরামর্শ
জিপিএফের লাভ নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে প্রতি অর্থবছরের শেষে শুধু মোট জমার সঙ্গে ১৩ শতাংশ গুণ না করে, ওপেনিং ব্যালান্স এবং মাসভিত্তিক জমার ওপর আলাদাভাবে সুদ গণনার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস বা আইবাস (iBAS++) থেকে বিস্তারিত স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করে যাচাই করলে প্রকৃত সুদ গণনার বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হবে।

