বাবা মারা যাওয়ার পর সম্পত্তি নিয়ে নতুন দাবি! চাচা বা প্রতিবেশী বলছেন ‘বাড়ি লিখে দিয়েছেন’—এমন পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকারীদের করণীয় কী?
পরিবারের কর্তা মারা যাওয়ার এক বা দুই বছর পর হঠাৎ করেই যদি কোনো চাচা, আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশী দাবি করেন—“আপনার বাবা জীবদ্দশায় বাড়ি বা জমি আমার নামে লিখে দিয়ে গেছেন”, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই উত্তরাধিকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে যখন মৃত ব্যক্তিকে আর জিজ্ঞাসা করার সুযোগ নেই এবং দাবিদারও কোনো দলিল দেখাচ্ছেন না, তখন কী করবেন ছেলে-মেয়েরা—এ প্রশ্ন অনেকেরই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মৌখিক দাবি কখনোই মালিকানার প্রমাণ নয়। সম্পত্তির মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য আইনসম্মত দলিল ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকতে হবে। তাই এমন পরিস্থিতিতে আবেগ নয়, আইনি প্রক্রিয়াই হওয়া উচিত উত্তরাধিকারীদের প্রধান ভরসা।
শুধু মুখের কথায় সম্পত্তির মালিক হওয়া যায় না
কোনো ব্যক্তি যদি দাবি করেন যে মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় তার নামে বাড়ি বা জমি লিখে দিয়েছেন, তাহলে সেই দাবির পক্ষে নিবন্ধিত বিক্রয় দলিল, দানপত্র (হেবা), কিংবা অন্য বৈধ আইনি নথি উপস্থাপন করার দায়িত্ব দাবিদারেরই।
শুধু “তিনি আমাকে দিয়ে গেছেন” বা “আমার কাছে লিখে দিয়েছেন” এমন বক্তব্য আইনগত মালিকানা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়।
উত্তরাধিকারীদের প্রথম করণীয়
এ ধরনের দাবি উঠলে উত্তরাধিকারীদের উচিত—
- দাবিদারের কাছে নিবন্ধিত দলিল দেখানোর অনুরোধ করা।
- সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ নিয়ে মৃত ব্যক্তির নামে কোনো বিক্রয় বা দান দলিল নিবন্ধিত হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা।
- ভূমি অফিস থেকে খতিয়ান, নামজারি ও রেকর্ড পরীক্ষা করা।
- প্রয়োজন হলে সনদপ্রাপ্ত আইনজীবীর মাধ্যমে দলিলের সত্যতা যাচাই করা।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো দলিলের সত্যতা যাচাই না করে সম্পত্তি ছেড়ে দেওয়া বা আপস করা উচিত নয়।
দলিল জাল হওয়ার সন্দেহ হলে কী করবেন?
যদি পরে কোনো দলিল উপস্থাপন করা হয় এবং সেটি জাল, প্রতারণামূলক বা মৃত ব্যক্তির প্রকৃত সম্মতি ছাড়া তৈরি হয়েছে বলে সন্দেহ হয়, তাহলে আদালতে দলিল বাতিলের মামলা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করার সুযোগ রয়েছে। আদালত দলিলের বৈধতা, স্বাক্ষর, সাক্ষী এবং নিবন্ধনের তথ্য পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত দেন।
উত্তরাধিকারীদের অধিকার কী?
যদি মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় আইনসম্মতভাবে সম্পত্তি অন্য কারও কাছে হস্তান্তর না করে থাকেন, তাহলে মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তি প্রচলিত উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হবে। এ ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ, প্রয়োজনীয় উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নথি এবং পরবর্তীতে নামজারির উদ্যোগ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ভূমি বিরোধের মূল কারণ হলো মৌখিক দাবি, অনিবন্ধিত কাগজপত্র এবং দীর্ঘদিন সম্পত্তির রেকর্ড হালনাগাদ না করা। তাই পরিবারের সদস্যদের উচিত মালিকের মৃত্যুর পর দ্রুত ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় নামজারি সম্পন্ন করা এবং সব কাগজপত্র নিরাপদে সংরক্ষণ করা। এতে ভবিষ্যতে ভুয়া দাবি বা প্রতারণার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
উপসংহার
কেউ যদি বাবার মৃত্যুর অনেক পরে এসে দাবি করেন যে বাড়ি বা জমি তাঁর নামে লিখে দেওয়া হয়েছিল, তাহলে শুধু কথার ভিত্তিতে সেই দাবি গ্রহণ করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। বৈধ নিবন্ধিত দলিল ও আইনসম্মত প্রমাণ ছাড়া এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তাই উত্তরাধিকারীদের উচিত শান্ত থাকা, দলিল যাচাই করা এবং প্রয়োজনে আইনগত সহায়তা নিয়ে নিজেদের অধিকার নিশ্চিত করা।

