জন্মতারিখ সংশোধনে নতুন নির্দেশনা, অনলাইনে যাচাইযোগ্য শিক্ষা সনদে আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষমতা বাড়াল ইসি
জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) জন্মতারিখ সংশোধনসংক্রান্ত আবেদনের নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় নতুন নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অনলাইনে যাচাইযোগ্য জেএসসি, মাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষা সনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদনকে ‘ক’ ক্যাটাগরির হিসেবে নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা এসব আবেদন নিষ্পত্তি করতে পারবেন, আবেদন যাচাইয়ের সময় কী কী বিধি অনুসরণ করতে হবে এবং একই তথ্য কতবার সংশোধন করা যাবে—এসব বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখের একটি পরিপত্রে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিপত্রের স্মারক নম্বর হিসেবে ১৭.০০.০০০০.০৬৪.২২.০৪৫.১৯ (অংশ-১)-৩৬৩৫ উল্লেখ রয়েছে।
অনলাইনে যাচাইযোগ্য শিক্ষা সনদে জন্মতারিখ সংশোধন
পরিপত্র অনুযায়ী, অনলাইনে যাচাইযোগ্য জেএসসি/মাধ্যমিক/সমমান শিক্ষা সনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন ‘ক’ ক্যাটাগরিভুক্ত হিসেবে নিষ্পত্তি করা যাবে। এ ধরনের আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসার, সিনিয়র জেলা/জেলা নির্বাচন অফিসার এবং জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (NID Wing) সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক ও পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, নির্ধারিত ও যাচাইযোগ্য শিক্ষা সনদ থাকলে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তির জন্য সব ক্ষেত্রেই উচ্চপর্যায়ে পাঠানোর প্রয়োজন হবে না। সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বিধি অনুযায়ী আবেদন যাচাই করে সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার-সংক্রান্ত বিভিন্ন সংশোধন এবং আবেদন ব্যবস্থার জন্য নির্ধারিত ফরম ও সেবা কাঠামো প্রকাশ করা রয়েছে।
শুধু শিক্ষা সনদ নয়, প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্রও যাচাই হবে
পরিপত্রে বলা হয়েছে, শিক্ষা সনদের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রমাণক বা দলিলাদি গ্রহণের ক্ষেত্রে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন ও বিদ্যমান SOP অনুসরণ করতে হবে।
অর্থাৎ, আবেদনকারী কোনো শিক্ষা সনদ দাখিল করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জন্মতারিখ পরিবর্তন হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সনদের সত্যতা ও অনলাইনে যাচাইযোগ্যতা পরীক্ষা করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অন্যান্য দলিলপত্রও বিবেচনা করবেন।
ইলেকট্রনিক অনুমোদন বা বাতিলের ক্ষেত্রে নোট দিতে হবে
নতুন নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, কোনো সংশোধনের আবেদন ইলেকট্রনিকভাবে অনুমোদন বা বাতিল করা হলে সংশ্লিষ্ট সিস্টেমে অবশ্যই প্রয়োজনীয় নোট বা কারণ উল্লেখ করতে হবে।
এর ফলে আবেদন অনুমোদন বা বাতিলের সিদ্ধান্তের পেছনে কী কারণ ছিল, তা সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকবে। এতে আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ বাড়বে।
কর্মকর্তাদের কাজ নিয়মিত মনিটরিং
পরিপত্রে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের তাদের অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দৈবচয়নের ভিত্তিতে প্রতি মাসে প্রত্যেক নিষ্পত্তিকারী কর্মকর্তার ন্যূনতম তিনটি আবেদন যাচাই করে যথাযথভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করতে হবে। পরে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন নির্ধারিত ছকে প্রস্তুত করে পরিচালক (অপারেশন্স)-এর ইন্টারনাল অ্যাকাউন্টে পাঠাতে হবে।
এর ফলে মাঠপর্যায়ে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তির মান, যাচাই প্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্তের যথার্থতা নিয়মিতভাবে পর্যালোচনার আওতায় আসবে।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ ও বড় ধরনের পরিবর্তনে উচ্চপর্যায়ের নিষ্পত্তি
পরিপত্রে কিছু আবেদনকে বিশেষভাবে উচ্চপর্যায়ে নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন এবং জন্মতারিখের পাশাপাশি নিজের নাম ও পিতা-মাতার নামের সম্পূর্ণ পরিবর্তনসংক্রান্ত আবেদন মহাপরিচালক পর্যায়ে নিষ্পত্তিযোগ্য হবে।
অর্থাৎ, সাধারণভাবে যাচাইযোগ্য জেএসসি, মাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষা সনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন মাঠপর্যায়ে নিষ্পত্তি করা গেলেও তুলনামূলকভাবে জটিল বা বড় ধরনের তথ্য পরিবর্তনের আবেদন উচ্চপর্যায়ে পাঠাতে হবে।
একই তথ্য দ্বিতীয়বার সম্পূর্ণ পরিবর্তন করা যাবে না
নতুন নির্দেশনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জন্মতারিখ, নিজের নাম এবং পিতা-মাতার নামের সম্পূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একই ফিল্ডে দ্বিতীয়বার সংশোধনের সুযোগ থাকবে না।
অর্থাৎ, কোনো নাগরিকের জন্মতারিখ বা নাম সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে একবার সংশোধন করা হয়ে গেলে একই তথ্য আবার সম্পূর্ণ পরিবর্তনের আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না।
এতে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বারবার পরিবর্তনের প্রবণতা কমানোর পাশাপাশি নাগরিকের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
নাগরিকদের জন্য কী বার্তা
নির্দেশনাটি কার্যকর হওয়ার ফলে যেসব নাগরিকের NID-তে জন্মতারিখ ভুল রয়েছে এবং তাদের কাছে অনলাইনে যাচাইযোগ্য জেএসসি, মাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষা সনদ রয়েছে, তারা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সংশোধনের আবেদন করতে পারবেন।
তবে আবেদন করার আগে শিক্ষা সনদে থাকা তথ্য এবং NID-তে থাকা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য, প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র এবং সংশোধনের পূর্ববর্তী ইতিহাস যাচাই করা জরুরি। কারণ সম্পূর্ণ জন্মতারিখ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একই ফিল্ডে দ্বিতীয়বার সংশোধনের সুযোগ না থাকার বিষয়টি নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের NID সেবা ব্যবস্থায় তথ্য সংশোধন, ঠিকানা পরিবর্তন, হারানো বা নষ্ট কার্ড পুনর্মুদ্রণসহ বিভিন্ন সেবা রয়েছে। ছবি ও স্বাক্ষর পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও আবেদন করে নির্ধারিত সময়ে সরাসরি উপস্থিত হয়ে বায়োমেট্রিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়।
সব মিলিয়ে, নতুন পরিপত্রের মাধ্যমে যাচাইযোগ্য শিক্ষা সনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও তদারকি আরও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। একই সঙ্গে বড় ধরনের তথ্য পরিবর্তন এবং পুনরায় সম্পূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কঠোরতা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

