নতুন যোগদানকারীদের বেতন নির্ধারণে বিশেষ বিধান, ৩০ জুনের ভিত্তিতে হবে হিসাব
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ কার্যকরের পর ১ জুলাই থেকে নতুন করে সরকারি চাকরিতে যোগদানকারী কর্মচারীদের বেতন কীভাবে নির্ধারণ হবে—এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন ছিল। প্রকাশিত গেজেটের SRO 347-এর ১০(চ)(৪) উপধারায় এ বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। ফলে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭-এর মধ্যে প্রথমবার সরকারি চাকরিতে যোগদানকারীদের বেতন নির্ধারণে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখকে একটি ভিত্তি ধরে হিসাব করা হবে।
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হওয়ার পর ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটে SRO 347-আইন/২০২৬ জারি করা হয়। নতুন বেতনস্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। গেজেটে পুরোনো বেতনস্কেলের সঙ্গে নতুন বেতনস্কেলের সামঞ্জস্য এবং বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন যোগদানকারীদের জন্য কী বলা হয়েছে
SRO 347-এর ১০(চ)(৪)-এর মূল বিষয় হলো—১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ তারিখ পর্যন্ত প্রথম নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে, তিনি যদি ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যোগদান করতেন, তাহলে বর্তমান বেতন কাঠামো অনুযায়ী যে বেতন পেতেন, সেটিকে একটি ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এর সঙ্গে যোগ হবে—
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন এবং বর্তমান বেতনের পার্থক্যের প্রযোজ্য শতাংশ।
অর্থাৎ, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীকে শুধু নতুন পে স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন দিয়ে বিষয়টি শেষ করা হবে না। বরং ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তিনি যোগ দিলে পুরোনো কাঠামোয় কত বেতন পেতেন—সেই হিসাবও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এটি নতুন যোগদানকারীদের জন্য গেজেটে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ transitional বা রূপান্তরকালীন ব্যবস্থা।
কেন ৩০ জুন ২০২৬ তারিখকে ভিত্তি ধরা হচ্ছে
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ কার্যকর হয়েছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে। ফলে ওই তারিখের আগের দিন, অর্থাৎ ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রচলিত বেতন কাঠামো এবং ১ জুলাই থেকে কার্যকর নতুন বেতন কাঠামোর মধ্যে একটি সেতু তৈরি করতে গেজেটে বিভিন্ন বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।
বিদ্যমান কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ৩০ জুনের মূল বেতন এবং সংশ্লিষ্ট পুরোনো স্কেলের বিপরীতে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের নিয়ম রয়েছে। একইভাবে ১ জুলাইয়ের পর প্রথম নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও ৩০ জুনকে ভিত্তি ধরে একটি কাল্পনিক বেতন নির্ধারণ করে তার ওপর নতুন স্কেলের সুবিধা প্রয়োগের বিধান করা হয়েছে।
বিষয়টি একটি উদাহরণে বোঝা যাক
ধরা যাক, কোনো পদে একজন নতুন কর্মচারী ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রথমবার সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেন।
এখন সরাসরি শুধু ১৫ সেপ্টেম্বরের নতুন নিয়োগের প্রারম্ভিক বেতন ধরে হিসাব না করে বিধান অনুযায়ী দেখা হবে—
ধাপ–১: তিনি যদি ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ওই পদে যোগ দিতেন, তাহলে প্রচলিত বেতন কাঠামোয় তাঁর বর্তমান বেতন কত হতো।
ধাপ–২: সেই বেতনের বিপরীতে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন কত।
ধাপ–৩: নতুন বেতন ও বর্তমান বেতনের মধ্যে পার্থক্য কত।
ধাপ–৪: SRO-এর অনুচ্ছেদ ১(৩)-এ নির্ধারিত প্রযোজ্য শতাংশ অনুযায়ী ওই পার্থক্যের অংশ যোগ করা হবে।
এভাবেই নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীর প্রাপ্য বেতন নির্ধারণ করা হবে।
পার্থক্যের কত শতাংশ পাওয়া যাবে
নতুন পে স্কেলের বেতন বৃদ্ধির পুরো পার্থক্য একসঙ্গে কার্যকর না হয়ে পর্যায়ক্রমে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রকাশিত গেজেটের ভিত্তিতে, ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্বদের ক্ষেত্রে নতুন ও পুরোনো বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ কার্যকর হবে।
এরপর ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্বদের ক্ষেত্রে ওই পার্থক্যের ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ কার্যকর হবে। পরবর্তী পর্যায়ে পূর্ণ সুবিধা কার্যকর হওয়ার বিধান রয়েছে।
তাই ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭-এর মধ্যে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে SRO 347-এর ১০(চ)(৪)-এ ব্যবহৃত “প্রযোজ্য শতাংশ” কথাটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েই কি পুরোনো কর্মচারীদের মতো পুরো বেতন পাওয়া যাবে?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। নতুন যোগদানকারীকে ৩০ জুন ২০২৬-এর একজন বাস্তব কর্মচারী হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে না। বরং তাঁর বেতন নির্ধারণের জন্য ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যোগদান করলে যে বেতন প্রাপ্য হতো—সেটিকে হিসাবের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এরপর নতুন জাতীয় বেতনস্কেল এবং সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের প্রযোজ্য শতাংশ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ হবে।
অর্থাৎ, এটি মূলত নতুন পে স্কেলে নতুন নিয়োগকারীদের বেতন নির্ধারণের জন্য একটি বিশেষ সূত্র।
কেন বিষয়টি নতুন চাকরিপ্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
নতুন পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পর সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন ছিল—তারা কি শুধু নতুন স্কেলের সর্বনিম্ন ধাপে বেতন পাবেন, নাকি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা নির্দিষ্ট নিয়মে পাবেন?
গেজেটের এই বিধান সেই প্রশ্নের একটি কাঠামোগত উত্তর দিয়েছে।
বিশেষ করে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭—এই এক বছরের সময়সীমার মধ্যে প্রথম নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের জন্য আলাদা বিধান থাকায় তাদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬-এর কাল্পনিক বর্তমান বেতন এবং নতুন জাতীয় বেতনস্কেলের পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক ব্যাখ্যাগুলোতেও একই বিধানের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
বেতন নির্ধারণে কোন বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে
নতুন যোগদানকারীদের ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারণের সময় কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে—
- নিয়োগটি প্রথম নিয়োগ কি না;
- যোগদানের তারিখ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭-এর মধ্যে কি না;
- সংশ্লিষ্ট পদের পুরোনো বেতনস্কেল কী ছিল;
- ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ওই পদে যোগ দিলে বর্তমান বেতন কত হতো;
- জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পদের বেতন কত;
- দুই বেতনের পার্থক্য কত;
- অনুচ্ছেদ ১(৩) অনুযায়ী ওই সময়ে পার্থক্যের কত শতাংশ প্রাপ্য।
এসব বিষয় বিবেচনা করেই চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
৯ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য আলাদা প্রভাব
নতুন পে স্কেলের বাস্তবায়ন পর্যায়ভেদে ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের মধ্যে শতাংশের পার্থক্য রাখা হয়েছে। ফলে একই সময়ে যোগদান করলেও গ্রেডভেদে নতুন কর্মচারীদের প্রাপ্য বেতনের হিসাব এক হবে না।
বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে পার্থক্যের ৫০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৭৫ শতাংশ কার্যকর হওয়ার বিধান থাকায় নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন নির্ধারণে গ্রেডটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পুরোনো কর্মচারীদের সঙ্গে নতুনদের হিসাব এক নয়
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যারা ইতোমধ্যে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে ৩০ জুনের বাস্তব মূল বেতন, সংশ্লিষ্ট পুরোনো স্কেল এবং নতুন স্কেলের অনুরূপ ধাপ ধরে বেতন নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে ১ জুলাইয়ের পর প্রথম নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীর ক্ষেত্রে ৩০ জুনে তাঁর বাস্তব কোনো বেতন ছিল না। তাই গেজেট একটি কাল্পনিক ভিত্তি নির্ধারণ করে দিয়েছে—অর্থাৎ তিনি ৩০ জুন যোগ দিলে কত বেতন পেতেন। তারপর সেই ভিত্তির ওপর নতুন স্কেলের প্রাপ্যতা হিসাব করা হবে।
এ কারণেই নতুন যোগদানকারীদের বেতন নির্ধারণের নিয়মটি বিদ্যমান কর্মচারীদের বেতন ফিক্সেশনের নিয়ম থেকে আলাদা।
বকেয়া ও কার্যকর তারিখ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর কার্যকর তারিখ ১ জুলাই ২০২৬। তবে বেতন বৃদ্ধির পুরো আর্থিক সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হচ্ছে। গেজেট অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নতুন ও পুরোনো বেতনের পার্থক্যের নির্ধারিত অংশ কার্যকর হবে।
এ কারণে নতুন যোগদানকারীদের ক্ষেত্রেও শুধু নিয়োগের তারিখ দেখলেই হবে না; কোন মাসে যোগদান করেছেন, কোন গ্রেডে নিয়োগ পেয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে পার্থক্যের কত শতাংশ কার্যকর—এসব বিষয়ও হিসাবের অংশ হবে।
সহকর্মীদের জন্য সহজ সূত্র
বিষয়টি খুব সহজভাবে মনে রাখতে চাইলে সূত্রটি এভাবে দেখা যায়—
৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যোগ দিলে প্রাপ্য বর্তমান বেতন
→ নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী বেতন
→ দুই বেতনের পার্থক্য নির্ধারণ
→ অনুচ্ছেদ ১(৩)-এর প্রযোজ্য শতাংশ প্রয়োগ
→ নতুন যোগদানকারীর প্রাপ্য বেতন নির্ধারণ
তবে এটি একটি ব্যাখ্যামূলক সূত্র। ব্যক্তির সঠিক বেতন নির্ধারণের সময় সংশ্লিষ্ট পদের বেতনস্কেল, নিয়োগের তারিখ, গ্রেড এবং গেজেটের অন্যান্য প্রযোজ্য বিধান একসঙ্গে যাচাই করতে হবে।
শেষ কথা
নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭-এর মধ্যে প্রথমবার সরকারি চাকরিতে যোগদানকারীদের জন্য SRO 347-এর ১০(চ)(৪) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান।
এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬-এর পুরোনো বেতন কাঠামো এবং ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর নতুন বেতন কাঠামোর মধ্যে একটি নির্ধারিত হিসাব-পদ্ধতি তৈরি করা।
ফলে নতুন যোগদানকারী সহকর্মীদের ক্ষেত্রে শুধু নিয়োগপত্রে উল্লেখিত গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন দেখলেই চূড়ান্ত বেতন বোঝা যাবে না। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তিনি যোগদান করলে কত বেতন পেতেন এবং সেই বেতন থেকে নতুন পে স্কেলে কত পার্থক্য তৈরি হয়েছে—এই হিসাবটিই হবে বেতন নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তাই নতুন যোগদানকারী কর্মচারীদের বেতন ফিক্সেশনের সময় SRO 347-এর ১০(চ)(৪) এবং অনুচ্ছেদ ১(৩) একসঙ্গে দেখে হিসাব করা জরুরি।

