২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি ব্যয়ে কড়াকড়ি: গাড়ি কেনা, নতুন ভবন, ভূমি অধিগ্রহণ ও বিদেশ সফরে বিধিনিষেধ
সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি ব্যয়ের বেশ কিছু খাতে কড়াকড়ি আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে জারি করা এক পরিপত্রে পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্থগিতাদেশ, সীমাবদ্ধতা ও পূর্বানুমোদনের শর্ত আরোপ করে।
অর্থ বিভাগের পরিপত্রটি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ের ওপর প্রযোজ্য করার কথা বলা হয়। একই ধরনের পরিপত্রের তথ্য সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোর নোটিশেও প্রকাশিত হয়েছিল।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পরবর্তী সময়ে অর্থ বিভাগ ৯ জুলাইয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যয়-সংকোচন নির্দেশনার বিষয়ে আপাতত কোনো কার্যক্রম না নিতে অনুরোধ করে। ফলে ৮ জুলাইয়ের পরিপত্রের বিধিনিষেধকে বর্তমান কার্যকর নিয়ম হিসেবে উপস্থাপন না করে এটিকে ওই সময়ের ঘোষিত ব্যয়-নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা জরুরি।
গাড়ি কেনায় বড় ধরনের বিধিনিষেধ
পরিপত্রে পরিচালন বাজেটের আওতায় সরকারি অর্থে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে ব্যয় বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। মোটরযান, জলযান ও আকাশযান কেনার জন্য বরাদ্দ অর্থ সাধারণভাবে ব্যয় না করার কথা বলা হয়।
তবে কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছিল। বিশেষ করে ১০ বছরের বেশি পুরোনো টিওঅ্যান্ডইভুক্ত যানবাহন প্রতিস্থাপন এবং নবগঠিত সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নতুন গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া। অ্যাম্বুলেন্স ও নিরাপত্তার কাজে ব্যবহারের গাড়ি ছাড়া প্রতিস্থাপন বা নতুন করে কেনা মোটরযান Full Electric Vehicle (FEV) হওয়ার শর্ত উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সরকার সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বৈদ্যুতিক গাড়ির মূল্যসীমা নিয়েও আলাদা নির্দেশনা জারি করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত গাড়ি ঋণও বন্ধের নির্দেশনা
পরিপত্রের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল সরকারি কর্মচারীদের গাড়ি কেনার জন্য দেওয়া সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম/ঋণ।
পরিপত্রে এই ধরনের অগ্রিম প্রদান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে যে বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়, সেটিও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
নতুন ভবন নির্মাণেও কড়াকড়ি
পরিচালন বাজেটের আওতায় নতুন আবাসিক, অনাবাসিক ও অন্যান্য ভবন স্থাপন বা নির্মাণের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
তবে চলমান নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ করার পরিবর্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রাখা হয়েছিল। কোনো চলমান নির্মাণকাজ ন্যূনতম ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে থাকলে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিয়ে অবশিষ্ট কাজের জন্য অর্থ ব্যয়ের সুযোগ রাখা হয়।
এর অর্থ হলো, সম্পূর্ণ নতুন প্রকল্প বা প্রাথমিক পর্যায়ের নির্মাণকাজের তুলনায় প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকা প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।
ভূমি অধিগ্রহণে অর্থ ব্যয়ে অনুমোদন বাধ্যতামূলক
পরিচালন বাজেটের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ খাতে বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ের ওপরও স্থগিতাদেশ আরোপের কথা বলা হয়।
অন্যদিকে উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হলে অধিগ্রহণ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতা যথাযথভাবে সম্পন্ন করে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নেওয়ার শর্ত রাখা হয়েছিল।
অর্থাৎ জমি অধিগ্রহণকে এমন একটি খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, যেখানে প্রয়োজনীয়তা ও প্রস্তুতি যাচাই না করে সরাসরি সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুযোগ সীমিত থাকবে।
উন্নয়ন বাজেটের যানবাহন ক্রয়েও বিধিনিষেধ
শুধু পরিচালন বাজেট নয়, উন্নয়ন বাজেটের আওতায় বাস্তবায়িত প্রকল্পের ক্ষেত্রেও নতুন গাড়ি, জলযান ও আকাশযান কেনার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের কথা বলা হয়েছিল।
তবে পরিপত্র জারির আগে অনুমোদিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়। অর্থাৎ পুরোনো অনুমোদিত প্রকল্পগুলোকে সম্পূর্ণভাবে একই নিয়মের আওতায় না এনে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
‘বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা’ খাতেও পূর্বানুমোদন
পরিকল্পনা কমিশনের অনুকূলে ‘বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা’ খাতে জিওবি বাবদ সংরক্ষিত বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নেওয়ার কথা বলা হয়।
এর মাধ্যমে উন্নয়ন বাজেটের এমন কিছু অর্থ, যা বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে সংরক্ষিত থাকে, তা ব্যয়ের আগে অতিরিক্ত আর্থিক যাচাইয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
সরকারি অর্থে বিদেশ ভ্রমণে বড় সীমাবদ্ধতা
পরিপত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিদেশ ভ্রমণ, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালা।
সরকারি অর্থায়নে বিভিন্ন ধরনের বিদেশি প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
তবে সব ধরনের বিদেশ ভ্রমণ একেবারে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম রাখা হয়।
যেসব ক্ষেত্রে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ রাখা হয়েছিল
প্রথমত, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠান বা দেশের দেওয়া স্কলারশিপ/ফেলোশিপের আওতায় মাস্টার্স ও পিএইচডি পড়ার জন্য বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ রাখা হয়।
দ্বিতীয়ত, বিদেশি সরকার, প্রতিষ্ঠান বা উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে আয়োজিত বৈদেশিক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করা যাবে।
তৃতীয়ত, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরিচালিত মৌলিক ও আবশ্যিক প্রশিক্ষণের বৈদেশিক অংশ উপযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানে আয়োজনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ সরকারি অর্থের সরাসরি ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও উচ্চশিক্ষা, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন এবং অপরিহার্য প্রশিক্ষণকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার নীতি নেওয়া হয়নি।
PSI ও FAT-এর ক্ষেত্রেও নতুন নির্দেশনা
সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিদেশে গিয়ে Pre-shipment Inspection (PSI) অথবা Factory Acceptance Test (FAT) করার ক্ষেত্রেও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের নীতি রাখা হয়েছিল।
পরিপত্র অনুযায়ী, কেবল জটিল প্রকৃতির পণ্য এবং যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে PSI ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক, সেসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা কারিগরিভাবে সার্টিফায়েড কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণ বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বা certified প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরীক্ষা করানোর বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়।
এর ফলে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় বিদেশ সফরের পরিবর্তে তৃতীয় পক্ষের স্বীকৃত পরীক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করার প্রবণতা বাড়ানোর নীতি স্পষ্ট হয়।
‘Value for Money’ নিশ্চিত করার নির্দেশ
পরিপত্রের শেষাংশে সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরা হয়—Value for Money বা অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থাৎ শুধু বরাদ্দ রয়েছে বলেই কোনো অর্থ ব্যয় করা যাবে না; বরং ব্যয়ের বিপরীতে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনগণ কতটা কার্যকর সুবিধা পাচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
এ ধরনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পেছনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছিল।
কেন এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল
পরিপত্রটির বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে সরকার মূলত কয়েকটি খাতকে লক্ষ্য করেছিল—
- নতুন সরকারি গাড়ি ও যানবাহন কেনা
- সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার সুদমুক্ত অগ্রিম
- নতুন ভবন নির্মাণ
- ভূমি অধিগ্রহণ
- সরকারি অর্থে বিদেশ প্রশিক্ষণ ও সেমিনার
- অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর
- বিদেশে PSI/FAT পরিচালনা
- বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দের অনুমোদনবিহীন ব্যবহার
অর্থাৎ দৈনন্দিন সরকারি কার্যক্রমের পাশাপাশি মূলধনি ব্যয় ও অপেক্ষাকৃত অনুৎপাদনশীল ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ কমানোর একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।
তবে বর্তমান অবস্থার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি
এই নথি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তারিখ ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত আলাদা করে উপস্থাপন করা।
৮ জুলাই ২০২৬ তারিখের পরিপত্রে যে বিধিনিষেধগুলো উল্লেখ করা হয়েছিল, সেগুলো ছিল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ঘোষিত নির্দেশনা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অর্থ বিভাগ ৯ জুলাইয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যয়-সংকোচনমূলক পত্রের ভিত্তিতে কার্যক্রম না নেওয়ার জন্য অনুরোধ করে বলে একাধিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়।
তাই ‘সরকার এখনো গাড়ি কেনা বন্ধ রেখেছে’, ‘বর্তমানে সব বিদেশ সফর বন্ধ’ বা ‘বর্তমানে ৭০ শতাংশের কম নির্মাণকাজ বন্ধ’—এভাবে সরাসরি বর্তমানকালীন খবর হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না, যদি না পরবর্তী কোনো কার্যকর আদেশ দিয়ে ওই বিধিনিষেধ পুনর্বহাল করা হয়ে থাকে।
সারসংক্ষেপ
৮ জুলাইয়ের অর্থ বিভাগের পরিপত্রে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের কড়াকড়ির রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল। নতুন গাড়ি কেনা, গাড়ি কেনার সুদমুক্ত অগ্রিম, নতুন ভবন নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং সরকারি অর্থে বিদেশ ভ্রমণ—এসব খাতে ব্যয় সীমিত করার পাশাপাশি অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদনের শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘Value for Money’ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
তবে পরবর্তী ৯ জুলাইয়ের নির্দেশনার কারণে এই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে আলাদা প্রশাসনিক পরিবর্তন আসে। ফলে নথিটির মূল সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমানে কোন বিধিনিষেধ কার্যকর—তা নির্ধারণে সর্বশেষ সরকারি আদেশই চূড়ান্ত বিবেচ্য।

