৯ম পে স্কেলে ২০ গ্রেডের বেতন কত থেকে শুরু, ১৮ বছর পর কত হবে? এক চার্টেই মিলবে পূর্ণাঙ্গ হিসাব
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগ্রহের শেষ নেই। নতুন বেতন কাঠামোয় কোন গ্রেডের মূল বেতন কত, চাকরিতে যোগদানের পর প্রতিবছর ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে বেতন কীভাবে বাড়বে এবং দীর্ঘ ১৮ বছর চাকরি করার পর একজন কর্মচারীর মূল বেতন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—এসব বিষয় নিয়ে চলছে আলোচনা। এসব প্রশ্নের একটি সমন্বিত চিত্র তুলে ধরেছে প্রকাশিত জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর একটি গ্রেডভিত্তিক বেতন চার্ট।
চার্টটিতে ১ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত প্রারম্ভিক মূল বেতন এবং পরবর্তী ১৮টি ইনক্রিমেন্টের হিসাব পাশাপাশি উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে একজন সরকারি কর্মচারী নিজের গ্রেড নির্বাচন করে চাকরির বিভিন্ন পর্যায়ে সম্ভাব্য মূল বেতনের একটি ধারণা পেতে পারেন।
২০টি গ্রেডের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো
প্রকাশিত চার্টে সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেডকে পাঁচটি ভিন্ন রঙে ভাগ করে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে গ্রেডভিত্তিক প্রারম্ভিক মূল বেতন এবং পরবর্তী বেতন বৃদ্ধির ধাপগুলো সহজে চিহ্নিত করা যায়।
চার্ট অনুযায়ী, ১ম গ্রেডে নির্ধারিত মূল বেতন দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। দ্বিতীয় গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা এবং তৃতীয় গ্রেডে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। চতুর্থ গ্রেডে এই অঙ্ক ১ লাখ টাকা।
অন্যদিকে পঞ্চম গ্রেডে ৮৬ হাজার টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডে ৭১ হাজার টাকা, সপ্তম গ্রেডে ৫৮ হাজার টাকা এবং অষ্টম গ্রেডে ৪৮ হাজার টাকা প্রারম্ভিক মূল বেতন দেখানো হয়েছে।
এভাবে বিভিন্ন গ্রেডের জন্য পৃথক বেতন নির্ধারণের পাশাপাশি পরবর্তী ইনক্রিমেন্টের ধাপগুলোও চার্টে তুলে ধরা হয়েছে।
১৮ বছর পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির হিসাব
এই চার্টের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ১৮ বছর পর্যন্ত ইনক্রিমেন্টের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা। সাধারণত বেতন কাঠামো বিশ্লেষণের সময় কর্মচারীরা শুধু প্রারম্ভিক মূল বেতন দেখেন। কিন্তু চাকরির মেয়াদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল বেতন কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশিত চার্টে প্রতিটি গ্রেডের জন্য ১ম, ২য়, ৩য় থেকে শুরু করে ১৮তম ইনক্রিমেন্ট পর্যন্ত আলাদা কলাম রাখা হয়েছে।
এর ফলে একজন কর্মচারী চাকরির শুরুতে যে মূল বেতন পাবেন, পরবর্তী বছরগুলোতে ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে সেটি কীভাবে বাড়তে পারে, তার একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায়।
তবে এখানে মনে রাখতে হবে, চার্টের ইনক্রিমেন্টগুলোকে সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রদর্শিত বেতনধাপ হিসেবে বুঝতে হবে। প্রকৃত বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইনক্রিমেন্টের প্রাপ্যতা, কার্যকর হওয়ার তারিখ এবং প্রযোজ্য বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে।

উচ্চ গ্রেডের বেতন ও সর্বোচ্চ সীমা
চার্টে উচ্চ গ্রেডের জন্য তুলনামূলক বেশি প্রারম্ভিক মূল বেতন দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে প্রথম চারটি গ্রেডের বেতন কাঠামোতে বড় অঙ্কের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে।
১ম গ্রেডে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারিত মূল বেতন দেখানো হলেও দ্বিতীয় গ্রেড থেকে পরবর্তী গ্রেডগুলোতে আলাদা প্রারম্ভিক বেতন রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, প্রথম গ্রেডের বেতনকে নির্ধারিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অন্যান্য গ্রেডের মতো একইভাবে ইনক্রিমেন্টের ধারাবাহিক হিসাবের সঙ্গে এটিকে তুলনা করা ঠিক হবে না।
নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন কাঠামো
সরকারি চাকরির নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য প্রারম্ভিক মূল বেতন এবং পরবর্তী ইনক্রিমেন্ট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ চাকরিজীবনে নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি তাদের আর্থিক অবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
চার্টে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত আলাদা রঙে বেতন কাঠামো দেখানো হয়েছে। এসব গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতনের পাশাপাশি ১৮ বছর পর্যন্ত ইনক্রিমেন্টের হিসাবও রয়েছে।
বিশেষ করে ২০তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। এই গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য পরবর্তী ইনক্রিমেন্টের ধাপগুলোও চার্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শুধু প্রারম্ভিক মূল বেতন বিবেচনা করে কোনো গ্রেডের কর্মচারীর প্রকৃত আর্থিক সুবিধা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য প্রযোজ্য সুবিধা যুক্ত হলে মোট বেতনের চিত্র ভিন্ন হবে।
সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতনের ব্যবধান কত?
চার্টে প্রদর্শিত তথ্য অনুযায়ী, ১ম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা।
এই হিসাবে দুই গ্রেডের মূল বেতনের পার্থক্য দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
অর্থাৎ সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন সর্বনিম্ন গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতনের তুলনায় প্রায় ৭ দশমিক ৮ গুণ।
এই পার্থক্য বেতন কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তবে সামগ্রিক বেতন বৈষম্য বিশ্লেষণ করতে হলে শুধু প্রারম্ভিক মূল বেতন নয়, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, দায়িত্ব এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও বিবেচনায় নিতে হবে।
মূল বেতনের সঙ্গে ভাতা যোগ হলে বাড়বে মোট প্রাপ্তি
জাতীয় বেতন স্কেল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেকেই মূল বেতন এবং মোট মাসিক বেতনকে একই হিসেবে বিবেচনা করেন। বাস্তবে এই দুটি বিষয় এক নয়।
মূল বেতনের সঙ্গে প্রযোজ্য ভাতা যোগ করে একজন সরকারি কর্মচারীর মোট মাসিক বেতন নির্ধারিত হয়। এর মধ্যে থাকতে পারে—
১. বাড়িভাড়া ভাতা।
২. চিকিৎসা ভাতা।
৩. শিক্ষা সহায়ক ভাতা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে।
৪. টিফিন ভাতা, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে।
৫. অন্যান্য অনুমোদিত ভাতা।
এ ছাড়া আয়কর, জিপিএফ বা অন্যান্য প্রযোজ্য কর্তনের কারণে হাতে পাওয়া বেতনের পরিমাণও পরিবর্তিত হতে পারে।
সুতরাং চার্টে প্রদর্শিত অঙ্কগুলো মূল বেতনের হিসাব। এগুলোকে সরাসরি হাতে পাওয়া মাসিক বেতন হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
নিজের গ্রেডের বেতন জানতে কীভাবে চার্ট ব্যবহার করবেন?
চার্টটি ব্যবহার করা তুলনামূলক সহজ। প্রথমে বাম পাশ থেকে নিজের গ্রেড নির্বাচন করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট গ্রেডের পাশে দেওয়া প্রারম্ভিক মূল বেতন দেখতে হবে।
পরবর্তী সময়ে একই সারিতে ডান দিকে এগোলে ১ম থেকে ১৮তম ইনক্রিমেন্ট পর্যন্ত বেতনের ধাপগুলো পাওয়া যাবে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো কর্মচারী যদি ১০ম গ্রেডে কর্মরত থাকেন, তাহলে ১০ম গ্রেডের সারি অনুসরণ করে প্রারম্ভিক মূল বেতন এবং পরবর্তী ইনক্রিমেন্টের অঙ্ক দেখতে পারবেন।
একইভাবে ১৩তম, ১৬তম কিংবা ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরাও নিজেদের সারি অনুসরণ করে বেতন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বুঝতে পারবেন।
বেতন নির্ধারণের আগে যেসব বিষয় যাচাই জরুরি
চার্টের মাধ্যমে সম্ভাব্য বেতনের ধারণা পাওয়া গেলেও প্রকৃত বেতন নির্ধারণের জন্য কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি।
- সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর অনুমোদিত গ্রেড ও পদ।
- নতুন কাঠামোতে প্রারম্ভিক বেতন নির্ধারণের নিয়ম।
- পূর্ববর্তী মূল বেতন ও অর্জিত ইনক্রিমেন্ট।
- পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডের প্রভাব।
- ইনক্রিমেন্ট কার্যকরের তারিখ।
- সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন ও বাস্তবায়ন নির্দেশনা।
বিশেষ করে একই গ্রেডে কর্মরত দুই কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ কিংবা পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের ইতিহাস ভিন্ন হলে তাদের মূল বেতনও ভিন্ন হতে পারে।
শেষ কথা
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর এই গ্রেডভিত্তিক চার্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক উপস্থাপনা। এতে ২০টি গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন থেকে শুরু করে ১৮ বছর পর্যন্ত ইনক্রিমেন্টের ধাপগুলো এক জায়গায় তুলে ধরা হয়েছে।
এর মাধ্যমে একজন কর্মচারী নিজের গ্রেডের বেতন কাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি বেতন বৃদ্ধির সম্ভাব্য চিত্র এবং অন্যান্য গ্রেডের সঙ্গে মূল বেতনের পার্থক্য সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন।
তবে চার্টে প্রদর্শিত তথ্যের সঙ্গে সরকারি প্রজ্ঞাপনের অনুমোদন বা প্রকাশনার পরিচিতি সংযুক্ত নেই। তাই এটিকে সরকারি গেজেটে প্রকাশিত চূড়ান্ত বেতন কাঠামো হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মূল প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জাতীয় বেতন স্কেল নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু প্রারম্ভিক মূল বেতন নয়, বরং ইনক্রিমেন্টসহ দীর্ঘমেয়াদি বেতন কাঠামো বিশ্লেষণ করলেই একজন সরকারি কর্মচারীর প্রকৃত আর্থিক সুবিধার চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।

মন্তব্য (০)