সন্তানের নাম রাখার আগে জেনে নিন সরকারি নির্দেশনা, জন্মনিবন্ধনে এক শব্দের নাম নিয়ে সতর্কতা
সন্তানের জন্মের পর তার প্রথম সরকারি পরিচয় তৈরি হয় জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে। তাই জন্মনিবন্ধন করার সময় শিশুর নাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। জন্মনিবন্ধন সনদে ব্যক্তির নাম কমপক্ষে দুটি শব্দবিশিষ্ট করার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়। এক শব্দের নামের কারণে ভবিষ্যতে পাসপোর্ট তৈরি, জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ এবং বিদেশে বিভিন্ন ধরনের সেবা পেতে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই এ নির্দেশনার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের ২৫ অক্টোবর ২০২৩ তারিখের একটি সরকারি স্মারকে এ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়। স্মারকটি স্থানীয় সরকার বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সভার সিদ্ধান্তের আলোকে জারি করা হয়েছিল। এতে জন্মনিবন্ধনে ব্যক্তির নাম কমপক্ষে দুই শব্দবিশিষ্ট করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়।
জন্মনিবন্ধনে দুই শব্দের নাম কেন প্রয়োজন?
জন্মনিবন্ধন একজন নাগরিকের প্রাথমিক পরিচয়সংক্রান্ত সরকারি দলিল। পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষাসনদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরির ক্ষেত্রে এই সনদের তথ্য ব্যবহার করা হয়। ফলে জন্মনিবন্ধনে থাকা নামের সঙ্গে অন্যান্য নথির নামের সামঞ্জস্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা অসাবধানতাবশত সন্তানের জন্মনিবন্ধনে শুধু একটি নাম ব্যবহার করেন। যেমন—সখিনা, রশিদা কিংবা অন্য কোনো একক নাম। পরবর্তী সময়ে পাসপোর্ট তৈরি বা বিদেশে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও নাগরিক সেবা গ্রহণের সময় এ ধরনের নামের কারণে সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
এ পরিস্থিতি এড়াতে জন্মনিবন্ধনের সময় থেকেই পূর্ণাঙ্গ ও কমপক্ষে দুই শব্দবিশিষ্ট নাম ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
কী ধরনের নাম রাখার কথা বলা হয়েছে?
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের স্মারকে ব্যক্তির নাম কমপক্ষে দুটি শব্দে লেখার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, সন্তানের নাম রাখার সময় শুধু একটি শব্দ ব্যবহার না করে দুটি বা তার বেশি শব্দের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ নাম নির্ধারণ করা উচিত।
উদাহরণ হিসেবে স্মারকে উল্লেখ করা হয়েছে—
- সখিনা বেগম
- সখিনা খাতুন
- আব্দুর রশিদ
- মোঃ আব্দুর রশিদ সরকার
এ ধরনের নামের মাধ্যমে ব্যক্তির পরিচয় তুলনামূলকভাবে পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব।
তবে নামের শব্দসংখ্যার পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজি বানানের সামঞ্জস্যও গুরুত্বপূর্ণ। জন্মনিবন্ধনে যে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে, ভবিষ্যতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাসপোর্ট ও অন্যান্য সরকারি নথিতে সেই নামের একই বানান ব্যবহার করা উচিত।
আগে থেকেই এক শব্দের জন্মনিবন্ধন থাকলে করণীয় কী?
যেসব ব্যক্তির জন্মনিবন্ধনে ইতোমধ্যে এক শব্দবিশিষ্ট নাম রয়েছে, তাঁদের বিষয়েও স্মারকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্মারক অনুযায়ী, যেসব ব্যক্তির এক শব্দের নামের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে শিক্ষাসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দলিল প্রস্তুত হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধনের আবেদন নিবন্ধক সহকারী আইডি থেকে করার কথা বলা হয়েছে। নামের প্রথম অংশ পূরণ করে দ্বিতীয় অংশে দুটি ফাঁকা স্পেস দেওয়ার বিষয়টিও স্মারকে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, যাঁদের বিদ্যমান সরকারি নথিতে এক শব্দের নাম রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন করে নাম পরিবর্তন করে অন্য নথির সঙ্গে অসামঞ্জস্য তৈরি না করে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
জন্মনিবন্ধনের নামের ভুলে যেসব সমস্যায় পড়তে পারেন
জন্মনিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে অন্যান্য পরিচয়পত্রের তথ্যের অমিল থাকলে নাগরিকদের বিভিন্ন পর্যায়ে ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে। বিশেষ করে—
১. পাসপোর্ট তৈরিতে জটিলতা: পাসপোর্ট আবেদনের সময় নামের তথ্য যাচাই করা হয়। জন্মনিবন্ধন ও অন্যান্য পরিচয়পত্রে নামের অসামঞ্জস্য থাকলে অতিরিক্ত যাচাই বা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
২. জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিতে সমস্যা: জন্মনিবন্ধনের তথ্য পরবর্তী পরিচয়সংক্রান্ত কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নামের ভুল ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
৩. শিক্ষাসনদে নামের অসামঞ্জস্য: বিদ্যালয়ে ভর্তি, পাবলিক পরীক্ষা এবং শিক্ষাসনদ তৈরির সময় জন্মনিবন্ধনের নামের সঙ্গে মিল না থাকলে সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
৪. বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও চাকরি: বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা অভিবাসনসংক্রান্ত কাজে বিভিন্ন পরিচয়পত্রের তথ্যের মিল থাকা প্রয়োজন। নামের অসামঞ্জস্য থাকলে অতিরিক্ত কাগজপত্র বা ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে।
৫. সরকারি সেবা গ্রহণে ভোগান্তি: বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাইয়ের সময় তথ্যের অমিল সমস্যা তৈরি করতে পারে।
অভিভাবকদের এখন কী করা উচিত?
সন্তানের জন্মের পর জন্মনিবন্ধন করানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের শুরু থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিশুর নাম নির্ধারণের আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা উচিত।
প্রথমত, সন্তানের জন্য কমপক্ষে দুটি শব্দবিশিষ্ট একটি পূর্ণাঙ্গ নাম নির্বাচন করা উচিত। দ্বিতীয়ত, নামের বাংলা ও ইংরেজি বানান আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, জন্মনিবন্ধনের আবেদন করার সময় বাবা-মায়ের নাম, জন্মতারিখ ও অন্যান্য তথ্য ভালোভাবে যাচাই করতে হবে।
এ ছাড়া জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর সনদ সংগ্রহ করে নামসহ সব তথ্য পুনরায় পরীক্ষা করা উচিত। কোনো ভুল থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।
সরকারি স্মারকের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের প্রকাশিত স্মারকটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| স্মারকের তারিখ | ২৫ অক্টোবর ২০২৩ |
| সভার সিদ্ধান্ত | ৯ অক্টোবর ২০২৩ |
| স্মারকের বিষয় | জন্মনিবন্ধনে ব্যক্তির নাম কমপক্ষে দুই শব্দবিশিষ্ট হওয়া |
| সংশ্লিষ্ট দপ্তর | জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয় |
| স্বাক্ষরকারী | মো. রাশেদুল হাসান |
| পদবি | রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) |
| সরকারি ওয়েবসাইট | orgbdr.gov.bd |
স্মারকটি বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল।
শেষ কথা
সন্তানের নাম শুধু পারিবারিক পরিচয়ের বিষয় নয়, এটি তার ভবিষ্যৎ নাগরিক পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জন্মনিবন্ধনে নামের ভুল বা অসম্পূর্ণতা থাকলে পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষাসনদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তাই সন্তানের জন্মনিবন্ধন করার আগে অভিভাবকদের সরকারি স্মারকে উল্লেখিত নির্দেশনা সম্পর্কে জানা এবং নামের সঠিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একবার জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর বিভিন্ন নথিতে একই নাম ও বানান বজায় রাখলে ভবিষ্যতের অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তি এড়ানো সম্ভব।

মন্তব্য (০)