Latest News

কর রেয়াত কমল, বাড়ল করের চাপ: মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবীদের উদ্বেগ, বেতন বাড়বে কি?

নতুন অর্থবছর ২০২৫-২৬ থেকে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াতের হার কমিয়ে ১৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে একই পরিমাণ বিনিয়োগ করেও করদাতারা আগের তুলনায় কম কর ছাড় পাবেন। অর্থনীতিবিদ ও চাকরিজীবী মহলে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কী পরিবর্তন হয়েছে?

এতদিন বিনিয়োগযোগ্য খাতে নির্ধারিত সীমার মধ্যে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর রেয়াত পাওয়া যেত। নতুন অর্থবছরে সেই হার কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।

প্রদত্ত উদাহরণ অনুযায়ী, যদি কোনো করদাতার করযোগ্য আয় ১০ লাখ টাকা হয় এবং তিনি ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন, তাহলে—

অর্থবছর ২০২৪-২৫

  • করযোগ্য আয়ের ৩% = ৩০,০০০ টাকা
  • বিনিয়োগের ১৫% = ৩০,০০০ টাকা
  • কর রেয়াত = ৩০,০০০ টাকা

অর্থবছর ২০২৫-২৬

  • করযোগ্য আয়ের ৩% = ৩০,০০০ টাকা
  • বিনিয়োগের ১০% = ২০,০০০ টাকা
  • কর রেয়াত = ২০,০০০ টাকা

অর্থাৎ একই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একজন করদাতাকে আগের তুলনায় ১০ হাজার টাকা বেশি কর পরিশোধ করতে হতে পারে।

কারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবেন?

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী, পেনশনভোগী এবং নিয়মিত করদাতাদের ওপর। কারণ তারা সাধারণত সঞ্চয়পত্র, জীবনবিমা, ডিপিএস, পেনশন স্কিম বা অন্যান্য অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করে কর রেয়াত গ্রহণ করতেন।

নতুন ব্যবস্থায় একই পরিমাণ সঞ্চয় বা বিনিয়োগ করেও কর সুবিধা কমে যাওয়ায় কার্যত তাদের কর দায় বৃদ্ধি পাবে।

মূল্যস্ফীতির সময়ে বাড়তি চাপ

বর্তমানে খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

এ অবস্থায় কর রেয়াত কমে যাওয়ায় চাকরিজীবীদের হাতে থাকা প্রকৃত আয় আরও কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে যাদের বেতন বৃদ্ধি সীমিত বা বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কম, তাদের জন্য অতিরিক্ত কর পরিশোধ নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।

বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা

কর রেয়াতের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে সঞ্চয় ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। রেয়াতের হার কমে গেলে অনেকেই বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারেন বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, বিনিয়োগে কর সুবিধা কমানো হলে জীবনবিমা, অবসরভাতা তহবিল এবং অন্যান্য সঞ্চয়মুখী খাতে অর্থপ্রবাহও কমে যেতে পারে।

বেতন বাড়বে কি?

বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের অন্যতম বড় প্রশ্ন হচ্ছে—করের চাপ বাড়লেও আয় কি একই হারে বাড়ছে?

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বা বেতন পুনর্নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো তা বাস্তবায়নের কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের অধিকাংশ কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক কম।

ফলে কর রেয়াত কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি কর্মজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

উপসংহার

নতুন অর্থবছরের কর নীতিতে সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য শক্তিশালী হলেও কর রেয়াত কমানোর সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্ত ও নিয়মিত করদাতাদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, তখন কর সুবিধা কমে যাওয়ার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—করদাতাদের ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু তাদের আয় বা বেতন কি সেই অনুপাতে বাড়ছে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, কর ব্যবস্থায় ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং করদাতাদের ক্রয়ক্ষমতা—দুই দিকই সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *