নাবালকের সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ে আদালতের অনুমতি বাধ্যতামূলক, আইন না মানলে বাতিল হতে পারে দলিল
নাবালক বা ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় সাধারণ জমি হস্তান্তরের মতো সহজ নয়। এ ধরনের সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি ছাড়া কোনো লেনদেন সম্পন্ন করা হলে তা ভবিষ্যতে আইনি জটিলতায় পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাবালকের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য আইন এ বিষয়ে কঠোর বিধান রেখেছে এবং আদালতের অনুমোদন ছাড়া সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আইনজীবীদের মতে, মুসলিম ও হিন্দু পারিবারিক আইন অনুযায়ী পিতা বা বৈধ প্রাকৃতিক অভিভাবক নাবালকের সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন। তবে অভিভাবক হওয়া মানেই নাবালকের সম্পত্তি নিজের ইচ্ছামতো বিক্রি করার অধিকার পাওয়া নয়। নাবালকের কোনো স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা হস্তান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট জেলা জজ আদালতের অনুমতি গ্রহণ করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালত কেবল তখনই এমন অনুমতি প্রদান করে যখন প্রমাণিত হয় যে সম্পত্তি বিক্রয় নাবালকের প্রকৃত কল্যাণে প্রয়োজন। যেমন—শিক্ষা ব্যয়, জরুরি চিকিৎসা, জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় ব্যয় বা নাবালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কারণে জমি বিক্রি অপরিহার্য হলে আদালত বিষয়টি বিবেচনা করে।
আইনজীবীরা জানান, আদালত প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে যাচাই করে। সম্পত্তি বিক্রির ফলে নাবালকের আর্থিক বা ভবিষ্যৎ স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে আদালত অনুমতি দেয় না। ফলে অভিভাবককে আদালতে যুক্তিসঙ্গত কারণ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করতে হয়।
অন্যদিকে, আদালতের অনুমতি ছাড়া সম্পাদিত কোনো বিক্রয় দলিল ভবিষ্যতে বাতিল হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। আইনি বিধান অনুযায়ী, নাবালক ব্যক্তি সাবালক হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে মামলা করে ওই সম্পত্তি হস্তান্তর চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। আদালত যদি দেখতে পান যে আইন অনুযায়ী অনুমতি নেওয়া হয়নি বা নাবালকের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দলিল বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ভূমি ও সম্পত্তি বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা ক্রেতাদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, নাবালকের মালিকানাধীন কোনো জমি বা সম্পত্তি কেনার আগে অবশ্যই জেলা জজ আদালতের অনুমতিপত্র বা ‘পারমিশন অর্ডার’-এর মূল কপি যাচাই করা উচিত। শুধু মৌখিক আশ্বাস বা দলিল লেখকের কথার ওপর নির্ভর না করে আদালতের আদেশের সত্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এছাড়া আদালতের অনুমতিপত্রের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট দলিলের সঙ্গে সংযুক্ত আছে কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি। কারণ আদালতের আদেশে নির্ধারিত বৈধ অভিভাবকই কেবল নাবালকের পক্ষে দলিলে স্বাক্ষর করতে পারেন। অন্য কোনো ব্যক্তি বা অননুমোদিত অভিভাবকের মাধ্যমে সম্পন্ন লেনদেন আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে কম দামে জমি বিক্রির লোভনীয় প্রস্তাব দেখিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাদের নাবালকের সম্পত্তি কেনার জন্য প্রলুব্ধ করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় আইনগত যাচাই-বাছাই ছাড়া এমন সম্পত্তি ক্রয় করলে ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মামলা-মোকদ্দমার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাদের পরামর্শ, নাবালকের সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বায়না বা রেজিস্ট্রেশনের আগে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তায় আদালতের নির্দেশনা, অভিভাবকের বৈধতা এবং প্রয়োজনীয় দলিলপত্র যাচাই করা উচিত। এতে যেমন নাবালকের অধিকার সুরক্ষিত হবে, তেমনি ক্রেতাও ভবিষ্যতের আইনি ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকতে পারবেন।
উপসংহার
নাবালকের সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নাবালকের অধিকার ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ব্যবস্থা। তাই এ ধরনের সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের আগে আইন মেনে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও যাচাই সম্পন্ন করা সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

