পিআরএল শেষেই শতভাগ পেনশন ও ফুল বেনিফিটের দাবি সরকারি কর্মচারীদের: ‘৫০% দিয়ে বিদায়’ বাতিলের আহ্বান
সরকারি চাকরিজীবীদের অবসরকালীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হলো ‘অবসর-উত্তর ছুটি’ বা পিআরএল (PRL)। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মচারী চাকরি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ১ বছর পিআরএল ভোগ করেন। কিন্তু এই পিআরএল শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত পেনশনে যাওয়ার সময় আর্থিক সুবিধা প্রাপ্তি ও ফিক্সেশন নিয়ে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও অস্পষ্টতা বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি— “যার যেদিন পিআরএল শেষ হবে, ঠিক সেদিন থেকেই তাকে শতভাগ (ফুল) বেনিফিট দিতে হবে। নামমাত্র ৫০% সুবিধা দিয়ে বিদায় করার চলমান বৈষম্যমূলক মানসিকতা বা জটিলতা পরিহার করতে হবে।”
মূল সংকট ও ৫০% এর ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’
তথ্য ও বিধিমালা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পিআরএল সময়কালকে এখন আর ‘পেনশনযোগ্য চাকরিকাল’ হিসেবে গণ্য করা হয় না। তবে এই সময়ে এলপিআর (LPR)-এর মতোই পূর্ণ বেতন ও অন্যান্য ভাতা (যেমন বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা) চালু থাকে। আসল জটিলতা তৈরি হয় পিআরএল শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত পেনশন নির্ধারণ (Fixation) এবং বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে।
অনেক সময় দেখা যায়, অর্থবছরের মাঝামাঝি বা বছরের এমন এক সময়ে কর্মচারীদের পিআরএল শেষ হয়, যার ফলে তারা পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বা সরকারের ঘোষিত নতুন কোনো পে-স্কেল/সুবিধার শতভাগ সুফল থেকে বঞ্চিত হন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মূল বেতনের একটি আংশিক বা ৫০% হিসাব ধরে তাদের আনুতোষিক (Gratuity) বা ল্যাম্পগ্রান্টের হিসাবের মারপ্যাঁচে ফেলে এককালীন চূড়ান্ত বিদায় দেওয়া হচ্ছে। একে চাকরিজীবীরা “৫০% দিয়ে বিদায় করার নীতি” এবং “শুভঙ্করের ফাঁকি” বলে অভিহিত করছেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি: ‘যেদিন শেষ, সেদিন থেকেই ফুল বেনিফিট’
আন্দোলনরত এবং পিআরএল-এ থাকা একাধিক সরকারি কর্মচারীর সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির বাজারে অবসরে যাওয়ার পর একজন কর্মচারীর একমাত্র সম্বল হয় তার পেনশন ও আনুতোষিক।
তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো:
-
চূড়ান্ত অবসরের দিনই ফিক্সেশন: পিআরএল শেষ হওয়ার ঠিক পরদিনই (চূড়ান্ত অবসরের প্রথম দিন) ওই সময়ের সর্বশেষ বাজারদর বা পে-স্কেলের সর্বোচ্চ স্কেল অনুযায়ী শতভাগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
-
ইনক্রিমেন্ট বৈষম্য দূরীকরণ: পিআরএল শেষ হওয়ার তারিখ ১ জুলাই হোক বা বছরের অন্য যেকোনো দিন হোক, ওই বছরের অর্জিত বা প্রাপ্য ইনক্রিমেন্ট পূর্ণাঙ্গভাবে যোগ করে চূড়ান্ত পেনশন নির্ধারণ করতে হবে।
-
ল্যাম্পগ্রান্ট ও গ্র্যাচুইটির সঠিক মূল্যায়ন: জমাকৃত অর্জিত ছুটির বিপরীতে ১৮ মাসের ল্যাম্পগ্রান্ট এবং আনুতোষিক প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আংশিক বা ৫০% এর কাটছাঁট নীতি রাখা যাবে না।
প্রশাসনিক জটিলতা ও স্পষ্টীকরণের অভাব
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সময়ের প্রজ্ঞাপন ও স্পষ্টীকরণে বলা হয়েছে, পিআরএল শেষে চূড়ান্ত অবসরের তারিখ নির্ধারিত হয় ৫৯ বছর পূর্তির পরদিন থেকে ১ বছর হিসাব করে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের হিসাবরক্ষণ অফিসগুলোতে (CAO/DAO) ফাইল প্রসেস করার সময় নানা আইনি জটিলতা ও বিধির ভুল ব্যাখ্যার কারণে কর্মচারীরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে উৎসবের মাসে পিআরএল শেষ হলে বা ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট ফিক্সেশনের সময় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন অবসরে যাওয়া ব্যক্তিরা।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
জনপ্রশাসন ও অর্থ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মতে, একজন সরকারি কর্মচারী তার জীবনের সোনালী ৩০-৩৫ বছর রাষ্ট্রের সেবায় বিলিয়ে দেন। অবসরের পর পিআরএল শেষে যদি তাকে পাওনা সুবিধার জন্য দিনের পর দিন টেবিলে টেবিলে ঘুরতে হয় কিংবা বৈষম্যমূলক নিয়মের কারণে আংশিক সুবিধা নিয়ে বিদায় নিতে হয়, তবে সেটি অত্যন্ত অমানবিক। সরকারের উচিত পিআরএল শেষ হওয়া মাত্রই কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে শতভাগ (Full Benefits) আর্থিক সুবিধা পেনশনারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেওয়ার স্থায়ী ব্যবস্থা করা।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের সংগঠনগুলো অনতিবিলম্বে এই ‘৫০% দিয়ে বিদায়ের প্রথা’ বা আংশিক বেনিফিটের নিয়ম সংশোধন করে শতভাগ আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারের উচ্চমহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

