ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান-মেম্বার প্রার্থী হতে যেসব যোগ্যতা থাকা বাধ্যতামূলক
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য (মেম্বার) কিংবা সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট কিছু আইনগত যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। শুধু জনপ্রিয়তা, সামাজিক অবস্থান কিংবা রাজনৈতিক সমর্থন থাকলেই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যায় না। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রার্থীর বয়স, নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকায় নাম থাকার বিষয়সহ আইনে নির্ধারিত যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্ত যাচাই করা হয়।
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ধারা ২৬ অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা এবং অযোগ্যতার বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা প্রকাশিত রয়েছে।
চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে প্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং তার বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের যেকোনো ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় প্রার্থীর নাম অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। অর্থাৎ চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের নির্দিষ্ট কোনো একটি ওয়ার্ডের ভোটার হওয়াই যথেষ্ট।
তবে আইনে নির্ধারিত কোনো অযোগ্যতার আওতায় পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।
সাধারণ সদস্য বা মেম্বার প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা
ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ সদস্য, যাকে সাধারণভাবে ইউপি মেম্বার বলা হয়, সেই পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং কমপক্ষে ২৫ বছর বয়স পূর্ণ হতে হবে।
তবে চেয়ারম্যান প্রার্থীর সঙ্গে সাধারণ সদস্য প্রার্থীর ভোটার তালিকাসংক্রান্ত শর্তের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
সাধারণ সদস্য পদে যে ওয়ার্ড থেকে একজন ব্যক্তি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তাকে সেই নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটার তালিকাভুক্ত ভোটার হতে হবে।
সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীর যোগ্যতা
ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক এবং কমপক্ষে ২৫ বছর বয়সী হতে হবে।
সংরক্ষিত নারী সদস্যের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডসমূহের অন্তর্ভুক্ত যেকোনো একটি ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় সংশ্লিষ্ট নারী প্রার্থীর নাম থাকতে হবে।
অর্থাৎ যে তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে একটি সংরক্ষিত নারী আসন গঠিত হয়, সেই ওয়ার্ডগুলোর যেকোনো একটির ভোটার হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অন্যান্য আইনগত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে প্রার্থী হতে পারবেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতা কি বাধ্যতামূলক?
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য এসএসসি, এইচএসসি কিংবা কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক—এমন বিধান স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ধারা ২৬-এ নেই।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থীদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল। সরকারিভাবে সেই তথ্যকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে জানানো হয়েছিল।
শুধু যোগ্যতা থাকলেই প্রার্থী হওয়া যাবে না
আইনে নির্ধারিত মৌলিক যোগ্যতা পূরণ করার পাশাপাশি প্রার্থীকে অযোগ্যতার বিধানগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
কারণ কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক, ২৫ বছর বয়সী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়া সত্ত্বেও আইনে উল্লেখিত অযোগ্যতার আওতায় পড়লে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারাতে পারেন।
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন অনুযায়ী আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হওয়া, দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায়মুক্ত না হওয়া, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ বা আনুগত্য স্বীকার করা, নির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়া, প্রজাতন্ত্র বা পরিষদের লাভজনক সার্বক্ষণিক পদে অধিষ্ঠিত থাকা, পরিষদের সঙ্গে নির্দিষ্ট আর্থিক স্বার্থসম্পন্ন চুক্তিতে যুক্ত থাকা, ঋণখেলাপিসহ আইনে উল্লেখিত বিভিন্ন কারণে একজন ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হতে পারেন।
তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রার্থীর নিজের আইনগত অবস্থান এবং নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় সতর্কতা জরুরি
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত পদ্ধতিতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দিতে হয়।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে নির্ধারিত কাগজপত্র, হলফনামা, জামানতের অর্থ জমার প্রমাণসহ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিত তথ্য ও দলিল দাখিল করতে হতে পারে। রিটার্নিং কর্মকর্তা মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় প্রার্থীর যোগ্যতা, অযোগ্যতা এবং জমা দেওয়া তথ্য ও কাগজপত্র পরীক্ষা করেন।
কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা, ভুল তথ্য দেওয়া কিংবা আইন অনুযায়ী অযোগ্য হওয়া প্রমাণিত হলে মনোনয়নপত্র বাতিল হতে পারে।
নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
ইউনিয়ন পরিষদ বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের নাগরিক সেবা, স্থানীয় উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং জনগণের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়।
ফলে যারা আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য বা সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান, তাদের আগেই নিজের ভোটার তালিকার তথ্য, বয়স, নাগরিকত্ব এবং আইনগত যোগ্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর নির্ভর না করে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত আইন, বিধিমালা, পরিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
সারকথা, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নির্বাচনে অংশ নিতে প্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, কমপক্ষে ২৫ বছর বয়স পূর্ণ হতে হবে এবং পদভেদে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় নাম থাকতে হবে। একই সঙ্গে আইনে নির্ধারিত কোনো অযোগ্যতার আওতায় থাকা যাবে না। বর্তমান আইনে চেয়ারম্যান বা সদস্য প্রার্থী হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করা হয়নি।

