হ্যাঁ ভোট আর না ভোট কি । সরকার কেন হ্যাঁ ভোট দিতে বলছে?
গণভোট ২০২৬—কেন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরব সরকার? বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক এক সাংবিধানিক গণভোট। একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, সবার নজর এখন গণভোটের ব্যালটের দিকে। এবারের গণভোটের মূল বিষয় হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন’।
‘হ্যাঁ-না’ ভোট আসলে কী?
সহজ কথায়, এটি জনগণের সম্মতির একটি পরীক্ষা। সরকার যখন কোনো বড় নীতি বা আইন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য কি না, তা যাচাই করতেই এই ভোট আয়োজন করা হয়। এবারের গণভোটে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হবে যে, তারা জুলাই সনদের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো সমর্থন করেন কি না। ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ দুটি ঘর থাকবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেদিকে যাবে, সেটিই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
সরকার কেন ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে বলছে?
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এবং সংস্কারপন্থী দলগুলো জোরালোভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চালাচ্ছে। সরকারের এই অবস্থানের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ রয়েছে:
১. জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন: ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের ডাক দেওয়া হয়েছিল, তাকে আইনি ও সাংবিধানিক রূপ দিতে চায় সরকার। তাদের মতে, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া মানে হলো জনগণের এই সংস্কারের প্রতি চূড়ান্ত অনুমোদন।
২. স্বৈরতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি রোধ: জুলাই সনদে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো মৌলিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। সরকার মনে করছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে ভবিষ্যতে কোনো সরকার চাইলেই সংবিধানকে নিজের মতো ব্যবহার করতে পারবে না।
৩. নতুন রাজনৈতিক পথরেখা: সরকার ও এনসিপি (ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি)-র মতো দলগুলো বলছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে ঋণখেলাপি ও দুর্নীতিমুক্ত একটি সংসদ গঠনের পথ সুগম হবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে এর আগেও তিনবার গণভোট হয়েছে:
১৯৭৭: জিয়াউর রহমানের শাসন ও নীতির ওপর আস্থা যাচাই (হ্যাঁ ভোট জয়ী)।
১৯৮৫: এইচ এম এরশাদের শাসনের বৈধতা যাচাই (হ্যাঁ ভোট জয়ী)।
১৯৯১: সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে ফেরার সাংবিধানিক প্রশ্নে (হ্যাঁ ভোট জয়ী এবং বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়)।
বিশ্লেষকদের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের গণভোট আগের চেয়ে ভিন্ন। ১৯৯১ সালের পর এটিই প্রথম বড় কোনো সাংবিধানিক গণভোট। তবে সরকারের সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা নিয়ে কিছু মহলে বিতর্কও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা রক্ষায় সরকারের সরাসরি কোনো পক্ষের হয়ে প্রচারণা চালানো ঠিক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই সংস্কার কোনো একক দলের নয় বরং জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য অপরিহার্য।
উপসংহার: ১২ ফেব্রুয়ারির এই ভোট কেবল সরকার পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং বাংলাদেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামোর খোলস পরিবর্তনের এক পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়, সাধারণ ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ চিহ্নে টিক দিয়ে নতুন পথের যাত্রী হন, নাকি ভিন্ন কোনো বার্তা দেন।
হ্যাঁ ভোট দিলে কি হবে?
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার অর্থ হলো সরকার যে প্রস্তাব বা নীতি আপনার সামনে পেশ করেছে, আপনি তার সাথে একমত। ২০২৬ সালের এই সম্ভাব্য গণভোটের প্রেক্ষাপটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে মূলত নিচের পরিবর্তন বা প্রভাবগুলো দেখা যেতে পারে:
১. সংবিধানের আমূল পরিবর্তন (জুলাই সনদ বাস্তবায়ন)
সরকার যে নতুন সংবিধানের খসড়া বা সংশোধনীর প্রস্তাব করেছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট বেশি পড়লে তা আইন হিসেবে কার্যকর হবে। এর ফলে বাংলাদেশের বিদ্যমান শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
২. ক্ষমতার ভারসাম্য ও দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ
সাধারণত এবারের সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে:
প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।
সংসদে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ (দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ) ব্যবস্থা চালু হতে পারে, যা আইন প্রণয়নে আরও স্বচ্ছতা আনবে।
৩. জুলাই অভ্যুত্থানের আইনি স্বীকৃতি
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে রাষ্ট্রীয় সংবিধানে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে করে ওই আন্দোলনের লক্ষ্যগুলো সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
৪. রাজনৈতিক সংস্কার ও স্বচ্ছতা
‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে এমন কিছু আইন কার্যকর হতে পারে যেখানে:
কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
নির্বাচন কমিশন এবং বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার আইনি ভিত্তি পাবে।
দলত্যাগী এমপিদের পদ হারানো সংক্রান্ত আইনের (৭০ অনুচ্ছেদ) সংস্কার হতে পারে।
৫. সরকারের বৈধতা ও শক্তির সংহতি
যদি বিপুল সংখ্যক মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়, তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বা সংস্কারপন্থী শক্তির নৈতিক ভিত্তি অনেক শক্তিশালী হবে। তারা আন্তর্জাতিক মহলে প্রমাণ করতে পারবে যে, দেশের জনগণ এই আমূল পরিবর্তনের পক্ষে।
সংক্ষেপে: ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া মানে হলো বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়ে সরকারের প্রস্তাবিত ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার রূপরেখায় আপনার সীলমোহর দেওয়া।
আপনি কি এই সংস্কার প্রস্তাবের কোনো নির্দিষ্ট পয়েন্ট (যেমন: প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ বা

