জাতীয় বেতন কমিশনের কার্যক্রমে ঢাবি সাদা দলের উদ্বেগ: অধ্যাপক মাকছুদুরের পদত্যাগকে সাধুবাদ
জাতীয় বেতন কমিশনের বর্তমান কার্যক্রম ও গতি-প্রকৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিএনপি-পন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি সম্মানজনক ও যুগোপযোগী বেতন কাঠামো নির্ধারণের যে প্রত্যাশা নিয়ে কমিশন কাজ শুরু করেছিল, বর্তমানে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি ২০২৬) সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান এবং যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম ও অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিবৃতিতে উল্লিখিত প্রধান বিষয়সমূহ:
-
অধ্যাপক মাকছুদুরের পদত্যাগ ও সংহতি: জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মাকছুদুর রহমান সরকারের পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে সাদা দল ‘সাহসী ও নীতিগত অবস্থান’ হিসেবে অভিহিত করে তাকে আন্তরিক সাধুবাদ জানিয়েছে। নেতৃবৃন্দ মনে করেন, তাঁর এই পদত্যাগই প্রমাণ করে যে কমিশনের ভেতরে সুস্থ ও বস্তুনিষ্ঠ কাজের পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে।
-
শিক্ষকদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনহীনতা: বিবৃতিতে বলা হয়, কমিশন যেভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাতে শিক্ষক সমাজের প্রকৃত দাবি ও প্রত্যাশা পূরণের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কমিশনের বর্তমান কর্মপদ্ধতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সাধারণ শিক্ষকদের হতাশ করেছে।
-
দাবি উপেক্ষা করার অভিযোগ: সাদা দলের নেতৃবৃন্দ জানান, তারা ইতিপূর্বে কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে সুনির্দিষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ দাবিগুলো পেশ করেছিলেন। সে সময় দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
-
মর্যাদা রক্ষার দাবি: নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, শিক্ষকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে কোনো বেতন কাঠামো তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কমিশনকে অবিলম্বে তাদের ‘ত্রুটিপূর্ণ’ অবস্থান সংশোধন করে শিক্ষকদের মর্যাদা ও স্বার্থ বজায় রেখে একটি গ্রহণযোগ্য সুপারিশ পেশ করার আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কমিশনের বর্তমান অসংগতিপূর্ণ কার্যক্রমের বিষয়ে ভবিষ্যতে সাধারণ শিক্ষকদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী কঠোর কর্মসূচি বা করণীয় ঠিক করা হবে।
প্রাসঙ্গিক তথ্য: এর আগে একই দিনে (১৫ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ড. মো. মাকছুদুর রহমান সরকার বেতন কমিশন থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সাব-কমিটির দেওয়া ৩৩টি প্রস্তাবের কোনো প্রতিফলন চূড়ান্ত প্রতিবেদনে রাখা হয়নি, যা উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বড় অন্তরায়।

শিক্ষকদের জন্য কি আলাদা বেতন কাঠামো তৈরি হবে?
জাতীয় বেতন কমিশনের বর্তমান কার্যক্রম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের বিবৃতির প্রেক্ষাপটে শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে যা জানা যায়:
১. আলাদা বেতন কাঠামোর দীর্ঘদিনের দাবি
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দীর্ঘকাল ধরে সিভিল সার্ভিসের কাঠামো থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র বা আলাদা বেতন স্কেলের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের যুক্তি হলো:
-
শিক্ষকতা পেশার বিশেষত্ব এবং গবেষণার প্রয়োজনীয়তা।
-
মেধাবীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করা।
-
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের (যেমন: ভারত বা শ্রীলঙ্কা) মতো শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর ও স্বতন্ত্র মর্যাদা নিশ্চিত করা।
২. বর্তমান পরিস্থিতির বিরোধ
সাদা দলের বিবৃতিতে এবং অধ্যাপক ড. মো. মাকছুদুর রহমান সরকারের পদত্যাগের পেছনে একটি বড় কারণ হলো—বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য যে বিশেষ সুপারিশগুলো করা হয়েছিল, সেগুলোর প্রতিফলন কমিশনের চূড়ান্ত কার্যক্রমে দেখা যাচ্ছে না।
-
অধ্যাপক মাকছুদুর রহমান অভিযোগ করেছেন যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গঠিত সাব-কমিটির ৩৩টি প্রস্তাব চূড়ান্ত প্রতিবেদনে গুরুত্ব পায়নি।
-
সাদা দল মনে করছে, বর্তমান কাঠামোতে শিক্ষকদের মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে না, বরং বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।
৩. সরকারের বর্তমান অবস্থান
এখন পর্যন্ত সরকার বা জাতীয় বেতন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক কোনো বেতন কাঠামোর ঘোষণা দেয়নি। তবে সাধারণত দুটি সম্ভাবনা থাকে:
-
স্বতন্ত্র স্কেল: যেখানে বিসিএস বা অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসের সাথে কোনো মিল থাকবে না।
-
সংশোধিত কাঠামো: যেখানে বর্তমান কাঠামোর মধ্যেই শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর গ্রেড বা বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হয়।
৪. শিক্ষকদের পরবর্তী পদক্ষেপ
সাদা দল তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে, যদি শিক্ষকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে কোনো বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়, তবে তারা সাধারণ শিক্ষকদের সাথে পরামর্শ করে আন্দোলনের মতো কঠোর কর্মসূচি দিতে পারেন। অর্থাৎ, সরকার যদি শিক্ষকদের জন্য আলাদা বা সম্মানজনক কাঠামো না রাখে, তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্থিরতা তৈরির সম্ভাবনা থেকে যায়।
সারসংক্ষেপ: শিক্ষকরা আলাদা কাঠামো চাইলেও কমিশনের বর্তমান গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে তারা হয়তো আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরেই শিক্ষকদের রাখতে চাচ্ছে। তবে আন্দোলনের মুখে বা বিশেষ বিবেচনায় সরকার শেষ মুহূর্তে শিক্ষকদের জন্য বিশেষ কোনো ‘গ্রেড’ বা ‘স্কেল’ ঘোষণা করতে পারে কি না, তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরেই নিশ্চিত হওয়া যাবে।

