ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন ২০২৬ : জানুন আপনার তথ্যের অধিকার ও আইনি সুরক্ষা
বাংলাদেশে বসবাসরত নাগরিক ও প্রবাসীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ এর গেজেট প্রকাশ করেছে । শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত হওয়ার পর আইনটি রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে । এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তির ব্যক্তিগত উপাত্তকে তার নিজস্ব সম্পদ হিসেবে গণ্য করা এবং এর অবৈধ ব্যবহার রোধ করা ।
কাদের জন্য এই আইন প্রযোজ্য?
এই আইনটি বাংলাদেশের সকল নাগরিক, বাংলাদেশে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিক এবং বাংলাদেশে কর্মরত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে । এমনকি কোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশের বাহির থেকে এ দেশের অভ্যন্তরে থাকা কারো তথ্য নিয়ে কাজ করেন, তবে তার বিরুদ্ধেও এই আইন প্রয়োগ করা যাবে ।
ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল উপাত্ত কী?
আইন অনুযায়ী, নাম, মোবাইল নম্বর, এনআইডি, বায়োমেট্রিক তথ্য (আঙুলের ছাপ, মুখচ্ছবি), জেনেটিক তথ্য এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্যকে ব্যক্তিগত উপাত্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে । বিশেষ করে ‘সংবেদনশীল উপাত্ত’ হিসেবে রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় বিশ্বাস, যৌন অভিমুখিতা এবং অপরাধের রেকর্ডকে কঠোর সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে ।
উপাত্তধারীর অধিকারসমূহ
এই আইনের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিক বা উপাত্তধারীদের বেশ কিছু শক্তিশালী অধিকার দেওয়া হয়েছে:
-
প্রবেশাধিকার ও বহনযোগ্যতা: নাগরিকরা তাদের তথ্য কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা জানতে পারবেন এবং প্রয়োজনে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে তথ্য স্থানান্তরের অনুরোধ করতে পারবেন ।
-
তথ্য সংশোধন: সংরক্ষিত তথ্যে কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন বা হালনাগাদ করার অধিকার নাগরিকের থাকবে ।
-
সম্মতি প্রত্যাহার ও তথ্য মুছে ফেলা: কোনো ব্যক্তি চাইলে তার দেওয়া তথ্যের ব্যবহারের সম্মতি যেকোনো সময় প্রত্যাহার করতে পারবেন এবং নির্দিষ্ট শর্তে তথ্য মুছে ফেলার (Right to be Forgotten) অনুরোধ করতে পারবেন ।
উপাত্ত-জিম্মাদার ও কর্মকর্তাদের দায়িত্ব
যেসকল সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জনগণের তথ্য সংগ্রহ করে (উপাত্ত-জিম্মাদার), তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে । গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একজন ‘প্রধান উপাত্ত কর্মকর্তা’ (Chief Data Officer) নিয়োগ দিতে হবে, যিনি তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন এবং কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করবেন ।
আইন লঙ্ঘন ও প্রশাসনিক জরিমানা
তথ্য সুরক্ষায় অবহেলা বা অধিকার লঙ্ঘনের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে:
-
নাগরিকের অধিকার প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানকে অনধিক ২৫ লক্ষ টাকা জরিমানা করা যাবে ।
-
গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত-জিম্মাদারের ক্ষেত্রে এই জরিমানার পরিমাণ অনধিক ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে ।
-
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি জরিমানার অতিরিক্ত হিসেবে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন ।
জাতীয় নিরাপত্তা ও অব্যাহতি
জাতীয় নিরাপত্তা, অপরাধ শনাক্তকরণ, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং সাংবাদিকতার মতো বিশেষ প্রয়োজনে উপাত্তধারীর সম্মতি ছাড়াই তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সুযোগ রাখা হয়েছে । তবে এসব ক্ষেত্রেও তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে ।
উপসংহার
ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই আইনটি একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি কার্যকর হওয়ার ফলে জনগণের ব্যক্তিগত তথ্যের বাণিজ্যিক অপব্যবহার রোধ হবে এবং ডিজিটাল সেবায় নাগরিকদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে ।

