এনজিও পরিচালনায় নতুন কড়াকড়ি: ‘বৈদেশিক অনুদান রেগুলেশন বিধিমালা ২০২৬’ জারি
বাংলাদেশে কর্মরত এনজিওগুলোর বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। ‘বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন বিধিমালা, ২০২৬’ শিরোনামের এই প্রজ্ঞাপনটি সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে প্রকাশিত হয় ।
নতুন এই বিধিমালার ফলে এনজিওগুলোর নিবন্ধন, অর্থছাড় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও বাধ্যবাধকতা যুক্ত হয়েছে।
১. নিবন্ধনের নতুন শর্ত ও মেয়াদ: নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, যেকোনো এনজিও বা সংস্থাকে বৈদেশিক অনুদান নিয়ে কাজ করতে হলে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। নিবন্ধনের আবেদনের সঙ্গে কমপক্ষে ৫০০০ (পাঁচ হাজার) মার্কিন ডলারের বৈদেশিক অনুদানের প্রতিশ্রুতিপত্র জমা দিতে হবে । একবার নিবন্ধন পাওয়ার পর এর মেয়াদ হবে ১০ বছর, যা আগে ভিন্ন ছিল । মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬ মাস আগেই নবায়নের আবেদন করতে হবে ।
২. একই পরিবারের সদস্য থাকা নিষেধ: এনজিওগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নির্বাহী কমিটিতে একই পরিবারের (মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী, আপন ভাই-বোন ও সন্তান) একাধিক সদস্য থাকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে । এছাড়া কমিটির সদস্যদের সামাজিক অবস্থান এবং তাদের কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা রাষ্ট্রবিরোধী কাজের রেকর্ড আছে কি না, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় গভীরভাবে যাচাই করবে ।
৩. অর্থছাড় ও মাদার একাউন্ট: প্রতিটি এনজিওর জন্য একটি বাধ্যতামূলক ‘মাদার একাউন্ট’ (মূল ব্যাংক হিসাব) থাকতে হবে, যার মাধ্যমে সমুদয় বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ করতে হবে । প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে পৃথক ‘প্রকল্প হিসাব’ খুলতে হবে । বহুবর্ষী প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রথম বছর ১০০% অর্থছাড় করা গেলেও পরবর্তী কিস্তির জন্য বিগত বছরের অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ।
৪. প্রশাসনিক ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ: এনজিওগুলো তাদের মোট প্রকল্প ব্যয়ের সর্বোচ্চ ২০% অর্থ প্রশাসনিক বা ওভারহেড খাতে ব্যয় করতে পারবে । এর অতিরিক্ত ব্যয় কোনোভাবেই প্রকল্প ব্যয় হিসেবে দেখানো যাবে না ।
৫. স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি ও সাইনবোর্ড প্রদর্শন: প্রকল্পের কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (DC) বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (UNO) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে । এছাড়া প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য (বাজেট ও কার্যক্রম) এনজিওর নিজস্ব ওয়েবসাইটে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও প্রকাশ করতে হবে এবং প্রকল্প এলাকায় দৃশ্যমান সাইনবোর্ডে প্রদর্শন করতে হবে ।
৬. বিশেষ বিধিনিষেধ: বিধিমালায় এনজিওগুলোর জন্য কিছু কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কোনো এনজিও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারবে না । এছাড়া ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন কাজ, ধর্মান্তরিত করা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে এমন কোনো উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া যাবে না । জাতীয় বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিতকারী কোনো কাজও নিষিদ্ধ করা হয়েছে ।
৭. জরুরি ত্রাণ ও বিশেষ বরাদ্দ: দুর্যোগকালীন জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য আবেদন প্রাপ্তির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ অবমুক্তির আদেশ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে । এছাড়া কোনো এনজিও যদি বছরে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ করে, তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যুরোর পূর্ব অনুমোদনের পরিবর্তে কেবল অবহিতকরণের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালনা করা যাবে ।
উপসংহার: নতুন এই বিধিমালা অনুযায়ী, মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক এই বিধিমালার প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করবেন এবং শর্ত ভঙ্গকারী সংস্থার নিবন্ধন স্থগিত বা বাতিলের ক্ষমতা রাখবেন ।

বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন বিধিমালা, ২০২৬

