ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনী আইন ২০২৬ : গ্রেফতার ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন
বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে “Code of Criminal Procedure (Amendment) Act, 2026” বা “ফৌজিদারি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন, ২০২৬” গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে । রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মতি লাভের পর এই আইনটি এখন কার্যকর, যা মূলত ১৯৫ বছরের পুরনো ১৮৯৮ সালের মূল আইনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারায় পরিবর্তন এনেছে ।
নিচে এই নতুন আইনের প্রধান উল্লেখযোগ্য দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
১. গ্রেফতার প্রক্রিয়ায় নতুন নিয়ম ও স্বচ্ছতা (ধারা ৪৬এ)
এখন থেকে পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাউকে গ্রেফতারের সময় নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মানতে বাধ্য থাকবে:
-
পরিচয় প্রদান: গ্রেফতারকারী কর্মকর্তাকে অবশ্যই নিজের নাম সংবলিত দৃশ্যমান পরিচয়পত্র ধারণ করতে হবে এবং দাবি করলে তা দেখাতে হবে ।
-
মেমোরেন্ডাম অব অ্যারেস্ট: গ্রেফতারের সময় একটি ‘গ্রেফতারি স্মারক’ বা মেমোরেন্ডাম তৈরি করতে হবে, যাতে অন্তত একজন সাক্ষী (পরিবারের সদস্য বা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি) এবং গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর থাকবে ।
-
পরিবারকে অবহিত করা: গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি যদি তার বাসা ছাড়া অন্য কোনো স্থান থেকে ধৃত হন, তবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার পরিবার বা বন্ধুকে বিষয়টি জানাতে হবে ।
-
আইনজীবী ও চিকিৎসা: গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি চাইলে গ্রেফতারের ১২ ঘণ্টার মধ্যে তার আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করতে পারবেন । এছাড়া শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলে বাধ্যতামূলকভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে ।
২. বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের সীমাবদ্ধতা (ধারা ৫৪)
পুলিশের বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের ক্ষমতাকে আরও সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে:
-
সাত বছরের কম কারাদণ্ড হতে পারে এমন অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশকে গ্রেফতারের কারণ লিখিতভাবে নথিবদ্ধ করতে হবে ।
-
প্রতিরোধমূলক আটক (Preventive Detention): কোনো ব্যক্তিকে শুধুমাত্র নিবর্তনমূলক আটকের উদ্দেশ্যে এই ধারায় গ্রেফতার করা যাবে না ।
-
গ্রেফতারের পরপরই ব্যক্তিকে গ্রেফতারের কারণ জানাতে হবে ।
৩. ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা ও রিমান্ডে কড়াকড়ি (ধারা ১৬৭)
-
আসামি যদি অসুস্থ বা মারাত্মকভাবে আহত থাকেন, তবে সশরীরে হাজির না করে ইলেকট্রনিক ভিডিও লিংকেজ (ভিডিও কনফারেন্স) এর মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থাপন করা যাবে ।
-
পুলিশ হেফাজতে (রিমান্ডে) থাকাকালীন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট বাধ্যতামূলকভাবে মেডিকেল পরীক্ষার নির্দেশ দেবেন এবং রিপোর্ট অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেবেন ।
৪. তদন্তের সময়সীমা ও ডিজিটাল সমন (ধারা ১৭৩বি ও ৬৯)
-
তদন্তের সময়: এখন থেকে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তথ্য প্রাপ্তির ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে । বিশেষ প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে সময় বাড়ানো যাবে, তবে ব্যর্থতায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে ।
-
ডিজিটাল সমন: আদালতের সমন এখন থেকে প্রথাগত পদ্ধতির পাশাপাশি SMS, ইমেইল বা মেসেজিং সার্ভিসের মাধ্যমেও পাঠানো যাবে ।
৫. জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি
পুরানো আমলের নামমাত্র জরিমানার পরিমাণ এই আইনে ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে:
-
মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলা: আদালত এখন থেকে মিথ্যা মামলার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দিতে পারবেন ।
-
ম্যাজিস্ট্রেটদের দণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে জরিমানার সীমা ২ হাজার-১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ক্ষেত্রবিশেষে ২ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে ।
৬. আপিল ও অন্যান্য পরিবর্তন
-
স্বল্প দণ্ড বা ছোট অংকের জরিমানার (৫ হাজার টাকা পর্যন্ত) বিরুদ্ধে আপিল করার বিধান সীমিত করা হয়েছে ।
-
বেত্রাঘাতের (Whipping) শাস্তি সংক্রান্ত বিধানগুলো আইন থেকে বিলুপ্ত করা হয়েছে ।
এই আইনটি মূলত ২০২৫ সালে জারিকৃত দুটি অধ্যাদেশকে রহিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দান করেছে । এর ফলে বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

