সঞ্চয়পত্র কেনা হচ্ছে আরও সহজ ও নিরাপদ: যুক্ত হচ্ছে অটোমেশন ও এভিএস পদ্ধতি
জাতীয় সঞ্চয়পত্র কেনা এবং এর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। গ্রাহকসেবা আরও সহজ, দ্রুত এবং নিরাপদ করতে ‘জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’-কে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। এর ফলে এখন থেকে গ্রাহকরা ঘরে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন। পাশাপাশি জালিয়াতি রোধে যুক্ত করা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (এভিএস)।
অর্থ বিভাগের সরকারি ঋণ ও আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের সাম্প্রতিক এক সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই খাতের আধুনিকায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।
নিরাপত্তায় যুক্ত হচ্ছে এভিএস ও পেমেন্ট গেটওয়ে
সঞ্চয়পত্র কেনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং অন্যের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অবৈধভাবে সঞ্চয়পত্র কেনা বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (এভিএস) এই অনলাইন সিস্টেমের সাথে যুক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং মালিকানা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে। বর্তমানে এই যাচাই প্রক্রিয়ায় ১০ মিনিট সময় লাগলেও ভবিষ্যতে তা ‘রিয়েল টাইম’ বা তাৎক্ষণিকভাবে করার কাজ চলছে। এছাড়া সঞ্চয়পত্রের মূল্য পরিশোধের জন্য যুক্ত করা হচ্ছে ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে।
সেলফ সার্ভিস মডিউল: ঘরে বসেই সেবা
সরকার একটি ‘সেলফ সার্ভিস মডিউল’ তৈরির কাজ করছে, যার মাধ্যমে একজন গ্রাহক কোনো ব্যাংকে সশরীরে না গিয়ে নিজেই নিজের সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং গ্রাহকসেবা আরও গতিশীল হবে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের মধ্যেই এই অটোমেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। এটি কার্যকর হলে মুনাফার টাকা তোলা বা সঞ্চয়পত্র কেনা—সবই হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে।
চেক জালিয়াতি ও অনিয়ম রোধে কড়া পদক্ষেপ
বর্তমানে চেকের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে চেক ক্লিয়ার হওয়ার আগেই সঞ্চয়পত্র ইস্যু হওয়ার একটি ঝুঁকি থাকে। এই অনিয়ম বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকাশ ঘরের (ক্লিয়ারিং হাউস) সঙ্গে সিস্টেমটির সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। এখন থেকে চেক পুরোপুরি ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত কোনো সঞ্চয়পত্র ইস্যু করা হবে না।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন,
“ডিজিটাল যাচাইকরণ ছাড়া অনলাইন আর্থিক সেবা নিরাপদ করা সম্ভব নয়। এভিএস চালু হলে প্রতারণা এবং অর্থ জালিয়াতি অনেকটাই কমে আসবে, যা গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সরকার একদিকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভর করছে, অন্যদিকে সুদের চাপ কমাতে বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে। তাই এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা অত্যন্ত জরুরি।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসমূহ
অটোমেশনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে কিছু চ্যালেঞ্জও চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
-
বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন।
-
জটিল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি।
-
রিয়েল টাইম ভেরিফিকেশন নিশ্চিত করা।
-
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার গ্রাহকদের ডিজিটাল দক্ষতার অভাব এবং তাদের জন্য সহজ ইউজার ইন্টারফেস তৈরি করা।
সরকারের আশা, এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠে সঞ্চয়পত্র খাতকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল করা সম্ভব হলে এটি দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থাপনায় একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এতে একদিকে যেমন সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটানো সহজ হবে, অন্যদিকে গ্রাহকদের তথ্যের নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।

