গ্রাহক আস্থার সংকটে ব্যাংকিং খাত : সুরক্ষার খোঁজে কোন ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ?
দেশের বর্তমান ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। নানা অনিয়ম, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি এবং তারল্য সংকটের খবরে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাংক নির্বাচন নিয়ে তৈরি হয়েছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। এক সময় শুধু ‘উচ্চ মুনাফা বা সুদ’ দেখে মানুষ টাকা রাখলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের মূল চিন্তার বিষয় এখন আমানতের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে শুধু মুনাফা নয়; বরং ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি, সুশাসন, দ্রুত লেনদেন সুবিধা এবং গ্রাহক সেবার মান দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বিভিন্ন আর্থিক সূচক ও পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে দেশের ব্যাংকিং খাতের কিছু ব্যাংকের তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো, যেগুলোকে তুলনামূলক নিরাপদ ও স্থিতিশীল মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বেসরকারি খাতে শীর্ষ ও স্থিতিশীল ব্যাংকসমূহ
বিভিন্ন আর্থিক সূচক, সুশাসন এবং ধারাবাহিক স্থিতিশীল পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক এবং সিটি ব্যাংক। দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী ক্যাপিটাল বেসের কারণে এই দুটি ব্যাংক গ্রাহক আস্থার দিক থেকে বেশ এগিয়ে রয়েছে।
এছাড়াও ভালো আর্থিক পারফরম্যান্স এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকির কারণে তালিকায় ভালো অবস্থানে রয়েছে নিচের ব্যাংকগুলো:
-
ইস্টার্ন ব্যাংক (EBL): করপোরেট ও রিটেল ব্যাংকিংয়ে ধারাবাহিক সুশাসনের জন্য পরিচিত।
-
প্রাইম ব্যাংক ও ডাচ-বাংলা ব্যাংক: শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার কারণে গ্রাহকদের পছন্দের শীর্ষে।
-
পূবালী ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংক: রক্ষণশীল ও নিরাপদ ঋণ বিতরণের কারণে সংকটের মধ্যেও নিজেদের স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে।
-
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (MTB): গ্রাহক সেবা এবং আধুনিক ব্যাংকিংয়ের সমন্বয়ে ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে।
-
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক: শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে আর্থিক সূচকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অবস্থান: সরকারি গ্যারান্টির স্বস্তি
বেসরকারি খাতের বড় একটি অংশে নানামুখী সংকট থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত বা সরকারি ব্যাংকগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরনের প্রথাগত আস্থা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি ব্যাংকে কোনো সংকট তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র বা সরকার এর দায়ভার নেয়, যা গ্রাহকদের এক ধরনের মানসিক স্বস্তি দেয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে তুলনামূলক বেশি নিরাপদ ও শক্তিশালী ধরা হয়: ১. সোনালী ব্যাংক ২. অগ্রণী ব্যাংক ৩. জনতা ব্যাংক
বিশেষ করে ট্রেজারি কার্যক্রম এবং সরকারি বড় বড় প্রকল্পের লেনদেন এসব ব্যাংকের মাধ্যমে হওয়ায় এদের বড় ধরনের তারল্য সংকটে পড়ার ঝুঁকি কম থাকে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: টাকা রাখার আগে কী দেখবেন?
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাজারে যেকোনো ব্যাংকে টাকা রাখার আগে গ্রাহকদের অন্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। তাদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৩টি বিষয় হলো:
১. ব্যাংকের স্থিতিশীলতা (Stability): ব্যাংকের খেলাপি ঋণের (NPL) পরিমাণ কেমন এবং ক্যাপিটাল পর্যাপ্ততা (CAR) কেমন, তা নজর রাখা। ২. নিরাপত্তা ও সুশাসন (Security & Governance): ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিতর্কিত কি না বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর একক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা। ৩. দ্রুত লেনদেন সুবিধা (Liquidity & Tech): সংকটের সময়েও ব্যাংকটি গ্রাহকের চাহিদামতো টাকা ফেরত দিতে পারছে কি না এবং তাদের ডিজিটাল বা অনলাইন ব্যাংকিং সেবা কতটা নির্বিঘ্ন, তা নিশ্চিত করা।
পরিশেষ: ব্যাংকিং খাতে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও ঢালাওভাবে সব ব্যাংক সংকটে নেই। সচেতনভাবে সঠিক ও শক্তিশালী ব্যাংক নির্বাচন করতে পারলে গ্রাহকের আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখা সম্ভব।

