Latest News

সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণে বড় পরিবর্তন, নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নের নির্দেশ

কৃষকের কাছে সময়মতো ও সহজে সার পৌঁছে দেওয়া এবং সার বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা–২০২৫ (সংশোধিত)’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। নতুন ব্যবস্থায় ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে সার ডিলার ইউনিট নির্ধারণ, ডিলার নিয়োগ, বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং বিক্রয় প্রতিনিধি ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অনুবিভাগ থেকে জারি করা এক চিঠিতে সংশোধিত নীতিমালাটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার কথা জানানো হয়েছে। চিঠিটির তারিখ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ / ৯ আগস্ট ২০২৬। এতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কেন সংশোধন করা হলো নীতিমালা

চিঠিতে বলা হয়েছে, সার বিতরণ ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল করা এবং কৃষকের কাছে সময়মতো সার সহজলভ্য করার লক্ষ্যে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা–২০২৫’ সংশোধন করা হয়েছে।

সংশোধিত নীতিমালার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে—

  • সময়োপযোগী নীতি প্রণয়ন এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা;
  • একটি সমন্বিত নীতিমালার আওতায় সার বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা;
  • ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে সার ডিলার ইউনিটের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করা;
  • একই পরিবেশে একাধিক ডিলার নিয়োগের সুযোগ রহিত করা;
  • ডিলারের কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করে ডিলারশিপ বাতিল বা নবায়নের ব্যবস্থা করা;
  • অনিয়মিত সার ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থার সুযোগ সীমিত/রহিত করা;
  • বিক্রয় প্রতিনিধি ব্যবস্থা প্রবর্তন;
  • বিক্রয় প্রতিনিধিদের কার্যক্রম মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রতিনিধি বাতিল বা নবায়নের ব্যবস্থা করা।

প্রতি তিন ওয়ার্ডে একটি ডিলার ইউনিট

সংশোধিত ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে ডিলার ইউনিটের সংখ্যা নির্ধারণ।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, ইউনিয়ন ও পৌরসভার ক্ষেত্রে প্রতি তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে একটি ডিলার ইউনিট গঠন করতে হবে। কৃষি ব্লক বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ইউনিয়ন বা পৌরসভায় সর্বোচ্চ ৩ জন সার ডিলারকে দায়িত্ব দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

বর্তমানে নিয়োজিত বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের মধ্যে উল্লিখিত দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করতে হবে। দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের পর কোনো ডিলার ইউনিটে ডিলার না থাকলে সংশোধিত নীতিমালার আলোকে নতুন ডিলার নিয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে।

এর ফলে নতুন করে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ডিলার ইউনিট কাঠামো অনুসরণ করতে হবে এবং ইচ্ছামতো অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগের সুযোগ থাকবে না।

সিটি করপোরেশন এলাকায় ডিলার নিয়োগেও নতুন নিয়ম

সিটি করপোরেশন এলাকার জন্যও আলাদা ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো সিটি করপোরেশন এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফসলি জমি থাকলে এবং সার ডিলার নিয়োগ যৌক্তিকভাবে প্রয়োজন হলে সেখানে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

তবে সিটি করপোরেশনে কতজন ডিলার থাকবে, তা শুধু স্থানীয়ভাবে নির্ধারণ করা যাবে না। কৃষিজমির পরিমাণ ও ফসলের নিবিড়তার ভিত্তিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সুপারিশ এবং ‘সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি’র অনুমোদনক্রমে ডিলারের সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে।

এ জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে জরুরি ভিত্তিতে সিটি করপোরেশন এলাকার কৃষিজমির পরিমাণ ও ফসলের নিবিড়তার ভিত্তিতে জরিপ পরিচালনা করতে হবে।

জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে সিটি করপোরেশন এলাকার জন্য প্রয়োজনীয় সার ডিলারের সংখ্যা প্রস্তাব আকারে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিতে উপস্থাপন করতে হবে। সেখানে বিবেচিত প্রস্তাব কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

নির্ধারিত সংখ্যার বেশি ডিলার নিয়োগ নয়

সংশোধিত নীতিমালায় ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে সংখ্যাগত সীমাও স্পষ্ট করা হয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সুপারিশের ভিত্তিতে সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত সংখ্যক ডিলার ইউনিট থাকবে।

অর্থাৎ ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় যে সংখ্যক ডিলার ইউনিট নির্ধারণ করা হবে, তার অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগ করা যাবে না।

এতে একই এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগ, ডিলারদের মধ্যে অসামঞ্জস্য এবং সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের সুযোগ কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

একজন ডিলারের সর্বোচ্চ ৩টি বিক্রয়কেন্দ্র

নতুন ব্যবস্থায় সার বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।

ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে প্রতিটি সার ডিলারের অধিক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩টি খোলা বিক্রয়কেন্দ্র থাকবে।

ডিলারের অধিক্ষেত্রের সুবিধাজনক স্থানসমূহে এসব বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের স্থান নির্বাচন করবে সংশ্লিষ্ট উপজেলা/জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি

তবে তিনটি বিক্রয়কেন্দ্রের মধ্যে একটি বিক্রয়কেন্দ্র ডিলার নিজে পরিচালনা করবেন। বাকি দুটি বিক্রয়কেন্দ্র ডিলার কর্তৃক মনোনীত সার বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে পরিচালনা করা যাবে।

অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় ডিলারের বিক্রয় কার্যক্রম বিস্তৃত করার সুযোগ থাকলেও তা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে রাখতে হবে।

বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগেও অনুমোদন লাগবে

বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে সার বিক্রয়ের সুযোগ থাকলেও ডিলার ইচ্ছামতো কাউকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন না।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিলার কর্তৃক মনোনীত সার বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে পরিচালিত বিক্রয়কেন্দ্রের কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনসাপেক্ষে পরিচালিত হবে। উপজেলা/জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পরই মনোনীত বিক্রয় প্রতিনিধি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।

এর ফলে ডিলারের পাশাপাশি বিক্রয় প্রতিনিধিদের কার্যক্রমও নজরদারির আওতায় আসবে।

ডিলারশিপ বাতিল বা নবায়নে মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ

সংশোধিত নীতিমালায় শুধু ডিলার নিয়োগ নয়, বিদ্যমান ডিলারদের কার্যক্রম মূল্যায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডিলারের কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী ডিলারশিপ বাতিল অথবা নবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একইভাবে বিক্রয় প্রতিনিধিদের কার্যক্রমও মূল্যায়নের আওতায় থাকবে।

অর্থাৎ শুধু একবার ডিলারশিপ পাওয়াই যথেষ্ট হবে না; সার বিতরণ, বিক্রয় ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

কৃষকের জন্য কী পরিবর্তন আসতে পারে

সংশোধিত নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো সার বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক করা। ডিলার ইউনিটের সংখ্যা নির্ধারণ, বিক্রয়কেন্দ্রের সর্বোচ্চ সীমা, বিক্রয় প্রতিনিধি ব্যবস্থার অনুমোদন এবং ডিলারদের কার্যক্রম মূল্যায়নের ফলে সার বিতরণ ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ বাড়বে।

বিশেষ করে একই এলাকায় অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগের সুযোগ সীমিত হওয়া এবং নির্দিষ্ট এলাকার জন্য নির্ধারিত ডিলার ইউনিটের মাধ্যমে সার বিতরণ পরিচালিত হওয়ায় কোন এলাকায় কোন ডিলার সার সরবরাহ করবেন—এ বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হবে।

পাশাপাশি ডিলারের অধীনে সর্বোচ্চ তিনটি বিক্রয়কেন্দ্র রাখার বিধান থাকায় কৃষকদের জন্য নির্ধারিত এলাকায় সার সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে ডিলার ইউনিট নির্ধারণ, পর্যাপ্ত সার সরবরাহ এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের ওপর।

সার্বিকভাবে যা থাকছে

সংশোধিত নীতিমালার আলোকে সার ডিলার ব্যবস্থায় মূলত ডিলার ইউনিট নির্ধারণ, ডিলার সংখ্যার সীমা, বিক্রয়কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ, বিক্রয় প্রতিনিধি প্রবর্তন এবং কার্যক্রম মূল্যায়ন—এই পাঁচটি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী সংশোধিত ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা–২০২৫ (সংশোধিত)’ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। ফলে সংশ্লিষ্ট জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন পর্যায়ে সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ ব্যবস্থায় নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

সোর্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *