ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ

TIN থাকলেই দায় শেষ নয়, দেরিতে রিটার্নে গুনতে হতে পারে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা

করদাতাদের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান এবং ২০২৬ সালের সংশোধনের ফলে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের বিধান রয়েছে। বিশেষ করে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর করবর্ষ শেষ হয়ে গেলে এবং কর কর্তৃপক্ষের নোটিশের পর বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করলে অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

আইনের ধারা ১৭৪-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করে পরে বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করলে করদাতাকে শুধু নির্ধারিত করই নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থও পরিশোধ করতে হতে পারে। আইনটির বর্তমান পাঠে এই অতিরিক্ত অর্থের হার ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে সময় এবং নোটিশের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

নোটিশের পর রিটার্ন দিলে অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ বা ১০ হাজার টাকা

ধারা ১৭৪-এর উপধারা (৩)-এর বিধান অনুযায়ী, করবর্ষ শেষ হওয়ার পর নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ধারা ২১২-এর অধীন নোটিশ জারি হলে এবং সেই নোটিশের প্রেক্ষিতে করদাতা বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করলে, ধারা ১৭৩ অনুযায়ী কর পরিশোধের পাশাপাশি পরিশোধযোগ্য করের ১৫ শতাংশ অথবা ১০ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে।

অর্থাৎ, কারও হিসাব অনুযায়ী পরিশোধযোগ্য কর ৫০ হাজার টাকা হলে তার ১৫ শতাংশ দাঁড়ায় ৭ হাজার ৫০০ টাকা। যেহেতু ন্যূনতম অতিরিক্ত অর্থ ১০ হাজার টাকা, সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দিতে হবে ১০ হাজার টাকা

আবার পরিশোধযোগ্য কর ১ লাখ টাকা হলে ১৫ শতাংশ দাঁড়াবে ১৫ হাজার টাকা। তখন ১০ হাজারের পরিবর্তে ১৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হবে।

তবে এটি মূল করের বিকল্প নয়। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নির্ধারিত করের পাশাপাশি আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের বিষয়টি আসে।

নোটিশের আগেও বিলম্বিত রিটার্নে অতিরিক্ত অর্থ আছে

এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ধারা ১৭৪-এর উপধারা (২)-এ নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর করদাতা স্বপ্রণোদিতভাবে বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করলে অতিরিক্ত কর হিসেবে পরিশোধযোগ্য করের ১০ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই পরিমাণ দিতে হয় বলে আইনের সংশ্লিষ্ট পাঠে উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু NBR-এর নোটিশ পাওয়ার পরের অতিরিক্ত অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর বিলম্বিত রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থের বিধান রয়েছে।

TIN আছে, কিন্তু রিটার্ন দেননি—তাহলে কী হবে?

অনেকেই মনে করেন, TIN নেওয়া হলেও বর্তমানে আয় নেই বা করযোগ্য আয় নেই বলে রিটার্ন না দিলেও সমস্যা হবে না। কিন্তু রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা এবং কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এক বিষয় নয়।

কোনো ব্যক্তি আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য হলে তার করযোগ্য আয় শূন্য হলেও শুধু সেই কারণে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। কারা রিটার্ন দাখিলে বাধ্য, তা আয়কর আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোতে নির্ধারিত হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তির ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক রিটার্ন দাখিলের বিধান রয়েছে।

তাই ‘কর দিতে হবে না’ আর ‘রিটার্ন দিতে হবে না’—দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয়।

সময়মতো রিটার্ন না দিলে কী ধরনের ঝুঁকি?

বিলম্বিত রিটার্নের ক্ষেত্রে করদাতার কয়েক ধরনের আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • নির্ধারিত কর পরিশোধ;
  • বিলম্বিত রিটার্নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অতিরিক্ত অর্থ;
  • পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনসম্মত অন্যান্য দায়;
  • নোটিশ জারির পর রিটার্ন দাখিল করলে ১৫ শতাংশ বা ১০ হাজার টাকার বিধান প্রযোজ্য হওয়ার সম্ভাবনা।

NBR-এর সাম্প্রতিক নির্দেশনাতেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করা করদাতাদের পরবর্তী সময়ে আইন অনুযায়ী কর পরিশোধ করে রিটার্ন দাখিলের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি

এখানে ‘১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত’ কথাটি সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়। কারণ আইনের ভাষায় ১৫ শতাংশ এবং ১০ হাজার টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সেটিই অতিরিক্ত অর্থ হিসেবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে করের পরিমাণ বেশি হলে অতিরিক্ত অর্থও ১০ হাজার টাকার চেয়ে বেশি হতে পারে।

একইভাবে, স্বপ্রণোদিতভাবে বিলম্বিত রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে উপধারা (২)-এর ১০ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকার বিধান এবং নোটিশের পর নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উপধারা (৩)-এর ১৫ শতাংশ অথবা ১০ হাজার টাকার বিধান—দুটিকে আলাদা করে বুঝতে হবে।

উদাহরণে বিষয়টি সহজভাবে

ধরা যাক, কোনো করদাতার নির্ধারিত কর ৮০ হাজার টাকা।

নোটিশের পর উপধারা (৩) অনুযায়ী বিলম্বিত রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে:
৮০,০০০ × ১৫% = ১২,০০০ টাকা।
এ ক্ষেত্রে ১২ হাজার টাকা ১০ হাজারের চেয়ে বেশি। তাই অতিরিক্ত অর্থ হবে ১২ হাজার টাকা

আবার কারও পরিশোধযোগ্য কর ৪০ হাজার টাকা হলে—
৪০,০০০ × ১৫% = ৬,০০০ টাকা।
এ ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা বেশি। তাই অতিরিক্ত অর্থ হবে ১০ হাজার টাকা

অর্থাৎ, কর যত বাড়বে, ১৫ শতাংশের হিসাব ১০ হাজার টাকার সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

করদাতাদের জন্য সতর্কবার্তা

আয়কর রিটার্নকে শুধু ‘কর দেওয়ার কাগজ’ হিসেবে দেখলে চলবে না। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক কাজে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে TIN থাকা ব্যক্তিদের নিজেদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আছে কি না এবং নির্ধারিত সময়সীমা কখন শেষ হচ্ছে—তা নিয়মিত যাচাই করা উচিত।

NBR-এর অনলাইন সিস্টেমেও উৎসে কর্তিত কর, অগ্রিম করসহ বিভিন্ন কর পরিশোধের তথ্য আপডেট করে রিটার্ন দাখিলের সুবিধা রয়েছে।

শেষ কথা

TIN আছে কিন্তু রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজন নেই—এমন ধারণা করে নিশ্চিন্ত থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করাই নিরাপদ। কারণ সময় পার হওয়ার পর বিলম্বিত রিটার্ন দাখিল করলে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের বিধান কার্যকর হতে পারে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নোটিশের পর সেই অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধযোগ্য করের ১৫ শতাংশ অথবা ১০ হাজার টাকা—যেটি বেশি, হতে পারে।

তাই NBR-এর নোটিশের অপেক্ষা না করে, নিজের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা যাচাই করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রিটার্ন দাখিল করা করদাতার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

সোর্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *