আজই কি ৯ম পে-স্কেলের গেজেট? দীর্ঘ আন্দোলনের পর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় সরকারি কর্মচারীরা
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নবম জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ (৯ম পে-স্কেল) নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আবারও নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। আজ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ গেজেট প্রকাশ হতে পারে—এমন প্রত্যাশা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে দিনের শুরু পর্যন্ত সরকারি প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত কপি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে আজই গেজেট হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তবে বিষয়টি যে বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে একাধিক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তথ্য এসেছে। ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদনের পর এখন মূল অপেক্ষা আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশের।
দীর্ঘ আন্দোলনের পর কাঙ্ক্ষিত অর্জনের প্রত্যাশা
বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবী আদায় ঐক্য পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক মো. ওয়ারেছ আলী এক বিবৃতিতে ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর্যায়ে আসায় মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছেন।
বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন, ত্যাগ, মামলা-হয়রানি ও বিভিন্ন কর্মসূচির ধারাবাহিকতার ফল হিসেবে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ বাস্তবায়নের এই পর্যায় এসেছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও সহযোদ্ধাদের অভিনন্দন এবং কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতা করা রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে।
৬ ফেব্রুয়ারির পদযাত্রার কথাও স্মরণ
দাবি আদায়ের আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ যমুনা অভিমুখে পদযাত্রার কথাও বিশেষভাবে স্মরণ করেছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, ওই কর্মসূচিতে যেসব সহযোদ্ধা গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন, তাদের ত্যাগ আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব পর্যায়ের কর্মচারীর প্রতিও সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ
দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের বিবৃতিতে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের সাবেক প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ আব্দুর সাকি এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরসহ বিভিন্ন নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে।
সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, তারা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। সংগঠনের বিবৃতিতে অতিরিক্ত পুলিশ প্রধান ফারুক আহমদ এবং সাবেক রমনা জোনের ডিসি মাসুদ আলমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রিসভায় কী অনুমোদন হয়েছে
৩১ আগস্ট ২০২৬ মন্ত্রিসভা জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন করে। অনুমোদিত কাঠামোতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী—
- ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন: ২০,০০০ টাকা
- ১ম গ্রেডের নির্ধারিত সর্বোচ্চ বেতন: ১,৫৬,০০০ টাকা
- নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকারিতা ধরা হয়েছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে।
- মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
- বিভিন্ন ভাতা নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরবর্তী সময়ে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হতে পারে। নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
কেন এখনো গেজেট প্রকাশ হয়নি?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—মন্ত্রিসভায় অনুমোদন আর গেজেট প্রকাশ একই ধাপ নয়।
১৭ সেপ্টেম্বর সকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের প্রায় দুই সপ্তাহ পরও প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি এবং খসড়াটি তখনো অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানোর আগে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি বিষয় চূড়ান্ত করার কাজ চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে ১৬ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে শুধু মূল বেতন নয়; বেসামরিক প্রশাসন, সামরিক বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, সরকারি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নতুন কাঠামো কীভাবে কার্যকর হবে, তার বিস্তারিত নির্দেশনা থাকতে হয়। এরপর খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং, চূড়ান্তকরণ এবং সরকারি মুদ্রণালয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
অর্থাৎ, গেজেট প্রকাশে বিলম্বকে শুধু একটি কাগজ প্রকাশের বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো প্রক্রিয়াটি বোঝা যাবে না। অনুমোদিত সিদ্ধান্তকে বাস্তব প্রয়োগযোগ্য আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোয় রূপ দেওয়ার জন্য একাধিক ধাপ রয়েছে।
১৭ সেপ্টেম্বর নিয়ে কেন এত প্রত্যাশা?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৭ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশের দাবি বা প্রত্যাশা নতুন করে জোরালো হয়েছে। তবে এ ধরনের তারিখের দাবি এবং সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশের বিষয় এক নয়।
বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের এক প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশের দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকলেও সরকারি কপি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এটিকে সরকারি ঘোষণা হিসেবে নিশ্চিত করা যায় না।
এদিকে অন্য কয়েকটি প্রতিবেদনে ১৭, ২১ বা ২২ সেপ্টেম্বরসহ একাধিক সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা এসেছে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রত্যাশা থাকলেও চূড়ান্ত তারিখ সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে।
গেজেট প্রকাশ হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বাস্তবায়ন
গেজেট প্রকাশের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আসল গুরুত্ব পাবে বেতন ফিক্সেশন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি।
কারণ মন্ত্রিসভার অনুমোদিত কাঠামোর পাশাপাশি চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে সাধারণত বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, নতুন মূল বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে, ইনক্রিমেন্টের হিসাব, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার বাস্তবায়ন নির্দেশনা বিস্তারিতভাবে থাকে।
এ কারণে শুধু নতুন পে-স্কেলের টেবিল প্রকাশ হলেই পুরো আর্থিক সুবিধা হাতে চলে আসবে—এমন ধারণা ঠিক হবে না। গেজেটের পর সংশ্লিষ্ট দপ্তর, অর্থ বিভাগ এবং হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সফটওয়্যার/পে-ফিক্সেশন কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রীকে কর্মচারী সংবর্ধনার উদ্যোগ
দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানানোর উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়েছে।
সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী স্থান, তারিখ ও সময় নির্ধারণ করে দিলে দেশের বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মচারীর উপস্থিতিতে তাকে সংবর্ধনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে এই সংবর্ধনা আয়োজনের বিষয়টি সংগঠনটির নিজস্ব উদ্যোগ ও প্রত্যাশা; এর বাস্তব আয়োজন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
সামনে এখন একটাই অপেক্ষা—চূড়ান্ত গেজেট
নবম জাতীয় বেতন স্কেল নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা, কমিশন, সচিব কমিটির সুপারিশ এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এখন পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ধাপ হলো চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ।
সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশ আজকের দিনটিকে তাই বিশেষভাবে দেখছেন। কেউ কেউ এটিকে দীর্ঘদিনের দাবির চূড়ান্ত স্বীকৃতির মুহূর্ত হিসেবে প্রত্যাশা করছেন। তবে বাস্তবতা হলো, সরকারি গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ১৭ সেপ্টেম্বরের প্রকাশ-তারিখ নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।
মন্ত্রিসভার অনুমোদন ইতোমধ্যেই হয়েছে এবং নতুন কাঠামোর কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধরা হয়েছে—এ দুটি বিষয় নিশ্চিত। এখন গেজেট প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন বিধান, বেতন ফিক্সেশন, ভাতা, পেনশন, বকেয়া এবং অন্যান্য সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে।
তাই সরকারি কর্মচারীদের বহুদিনের প্রতীক্ষার কেন্দ্রবিন্দু এখন একটাই—৯ম জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬-এর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন। সরকারি গেজেট প্রকাশ হলেই প্রত্যাশা, আলোচনা ও জল্পনার অবসান ঘটিয়ে নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তব রূপ স্পষ্ট হয়ে যাবে।

