অবশেষে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে নবম পে স্কেল, গেজেট প্রকাশ এখন শেষ ধাপে
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের খসড়া ১৭ সেপ্টেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ভেটিংয়ের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে গেজেট জারির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে—কবে গেজেট প্রকাশ হবে? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভেটিং শেষ হওয়ার পর আর বড় কোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন নেই; এরপর প্রজ্ঞাপন জারির আনুষ্ঠানিক ধাপগুলো সম্পন্ন হবে। সে কারণে যেকোনো সময় গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট তারিখে গেজেট প্রকাশ হবে—এমন সরকারি ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর গেজেট নিয়ে অপেক্ষা
নবম জাতীয় পে স্কেল-২০২৬ গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পায়। অনুমোদনের সময় নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে বাস্তবায়ন একবারে না করে ধাপে ধাপে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর দ্রুত গেজেট প্রকাশের প্রত্যাশা তৈরি হলেও প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তা হয়নি। এর পেছনে প্রজ্ঞাপনের খসড়া পর্যালোচনা, বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য প্রয়োগবিধি নির্ধারণ, পেনশন-সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ এবং আইবাস++-এ প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের মতো একাধিক প্রশাসনিক কাজ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো—খসড়া প্রজ্ঞাপন আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভেটিং সম্পন্ন হলে গেজেট প্রকাশের পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।
গেজেটের আগে ভেটিং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কোনো বড় সরকারি আর্থিক সুবিধা বা বেতন কাঠামো কার্যকর করার আগে সংশ্লিষ্ট আদেশের ভাষা, বিধান, আইনগত সামঞ্জস্য এবং প্রয়োগের বিষয়গুলো যাচাই করা হয়। নবম পে স্কেলের ক্ষেত্রেও প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এটি শেষ হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মূল গেজেটের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক এসআরও জারির প্রস্তুতিও রয়েছে।
অর্থাৎ শুধু একটি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করলেই পুরো বাস্তবায়ন শেষ হচ্ছে না। মূল পে স্কেল, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাহিনীর প্রয়োগবিধি, বেতন নির্ধারণ এবং পেনশনসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের জন্য একাধিক প্রশাসনিক আদেশ প্রয়োজন হবে।
মোট ছয়টি এসআরও জারির প্রস্তুতি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জাগো নিউজ জানিয়েছে, নতুন পে স্কেলের ক্ষেত্রে একটি মূল এসআরওর পাশাপাশি আরও পাঁচটি পৃথক এসআরও জারির প্রস্তুতি চলছে। অর্থাৎ মোট ছয়টি এসআরও জারি হতে পারে।
এসব পৃথক ব্যবস্থার আওতায় থাকতে পারে—
- বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী
- বাংলাদেশ পুলিশ
- বিজিবি
- স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান
- সশস্ত্র বাহিনী
- বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস
এসব ক্ষেত্রে নতুন বেতন, ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা কীভাবে প্রয়োগ হবে, তা সংশ্লিষ্ট এসআরওতে বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হবে।
সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার
অনুমোদিত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল থাকছে। তবে গ্রেডভেদে মূল বেতনে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন কাঠামোতে—
| বিষয় | বর্তমান | নতুন পে স্কেল |
|---|---|---|
| ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন | ৮,২৫০ টাকা | ২০,০০০ টাকা |
| ১ম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন | ৭৮,০০০ টাকা | ১,৫৬,০০০ টাকা |
| কার্যকর তারিখ | — | ১ জুলাই ২০২৬ |
গ্রেডভেদে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাতও পরিবর্তন করা হয়েছে।
একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাড়বে বেতন
নবম পে স্কেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গেজেট প্রকাশের পরও পুরো বেতন কাঠামো একসঙ্গে কার্যকর হবে না।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের অর্থাৎ ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। আর বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
এ কারণে গেজেট প্রকাশের পরপরই প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর হাতে নতুন কাঠামোর পুরো বেতন পৌঁছে যাবে—বিষয়টি এমন নয়। বরং সংশ্লিষ্ট ধাপ অনুযায়ী বেতন পুনর্নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন হবে।
পেনশনভোগীদের জন্যও পরিবর্তন
নতুন পে স্কেলের প্রভাব শুধু কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও ধাপে ধাপে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন স্তরের নিট পেনশনভোগীদের জন্য পৃথক হারে বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ পদ্ধতি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ জন্য অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন-সংক্রান্ত তথ্যও আইবাস++-এ হালনাগাদ করা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আইবাস++-এও পরিবর্তন আসছে
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য শুধু গেজেট প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ, পেনশন হিসাব এবং নতুন কাঠামো অনুযায়ী অর্থ পরিশোধের জন্য আইবাস++ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।
বিশেষ করে যারা ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন, তাদের পেনশন-সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করার কাজও চলছে।
ফলে গেজেট প্রকাশের পর অর্থ মন্ত্রণালয়, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নিজ নিজ পর্যায়ে সফটওয়্যার ও বেতন-সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।
ইনক্রিমেন্ট ও ভাতাতেও পরিবর্তন
নতুন পে স্কেলে শুধু মূল বেতন নয়, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও বিভিন্ন ভাতাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০তম থেকে ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট রাখার কথা বলা হয়েছে। উচ্চতর গ্রেডে ইনক্রিমেন্টের হার ধাপে ধাপে কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতার কাঠামোতেও পরিবর্তনের কথা এসেছে।
নতুন কাঠামোয় সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতা চালুর কথা বলা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে মাসিক ১৫০ টাকা এবং প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডে ৫০০ টাকা মোবাইল ভাতার প্রস্তাবের কথা প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এসব সুবিধার বাস্তব প্রয়োগের সময় ও পদ্ধতি চূড়ান্ত গেজেট এবং সংশ্লিষ্ট এসআরওতে স্পষ্ট হবে।
কেন এত সময় লাগছে?
নবম পে স্কেলের গেজেট নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বড় কোনো নীতিগত জটিলতার কথা উঠে আসেনি।
বরং কয়েকটি কারণে সময় লাগছে—
প্রথমত, বিশাল আকারের প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট বিধান আইনগতভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য পৃথক এসআরও প্রস্তুত করতে হচ্ছে।
তৃতীয়ত, নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ায় বেতন নির্ধারণের পদ্ধতিও সুনির্দিষ্ট করতে হচ্ছে।
চতুর্থত, কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের তথ্যও নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হচ্ছে।
পঞ্চমত, আইবাস++-এ প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেছেন, কার্যক্রমে কোনো জটিলতা নেই; বরং সবকিছু নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে বাস্তবায়নের সময় কোনো সমস্যা না হয়।
গেজেট কবে?
এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপডেট হলো, ১৭ সেপ্টেম্বর খসড়া প্রজ্ঞাপন আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে গেছে এবং ভেটিংয়ের অধিকাংশ কাজ শেষ হওয়ার কথা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তাই গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়েছে। ভেটিংয়ের অবশিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেই পরবর্তী ধাপে প্রজ্ঞাপন জারি করা সম্ভব হবে।
তবে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো সরকারি গেজেট প্রকাশের তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। ফলে ‘আজই’, ‘কালই’ বা নির্দিষ্ট কোনো তারিখে গেজেট হবে—এ ধরনের তথ্যকে সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত খবর হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
সারসংক্ষেপ
নবম পে স্কেলের বর্তমান অবস্থাকে যদি ধাপে ভাগ করা হয়, তাহলে চিত্রটি এমন—
মন্ত্রিসভায় অনুমোদন → খসড়া ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি → আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং → এসআরও/প্রজ্ঞাপন জারি → আইবাস++ ও বেতন পুনর্নির্ধারণ → ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন।
বর্তমানে প্রক্রিয়াটি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে রয়েছে। ভেটিং শেষ হলে গেজেট প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা এগোবে। তাই ‘গেজেট এখন যেকোনো দিন’—এমন প্রত্যাশার ভিত্তি তৈরি হলেও, চূড়ান্ত নিশ্চিত খবর হবে কেবল সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরই।

