ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ

৫ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে ৬ বছরে দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা, মুনাফা যাবে ডিপিএস-এ?

হাতে থাকা ৫ লাখ টাকা নিরাপদে বিনিয়োগ করে কয়েক বছর পর সেই অর্থ দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা অনেক সঞ্চয়কারীরই থাকে। বিশেষ করে ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে মূলধন রেখে নিয়মিত পাওয়া মুনাফা আবার DPS-এ বিনিয়োগ করলে মূল অর্থের সঙ্গে অতিরিক্ত সঞ্চয় তৈরি করা সম্ভব। তবে বর্তমান মুনাফার হার, উৎসে কর, DPS-এর সুদ এবং সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ বিবেচনায় নিয়ে হিসাব না করলে ৬ বছরে ৫ লাখ টাকা থেকে কর-পরবর্তী ১০ লাখ টাকা পাওয়া নিশ্চিত নয়।

বর্তমান সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ ৩ বছর। ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফার হার ১১.৮২ শতাংশ এবং এর বেশি বিনিয়োগে ১১.৭৭ শতাংশ। এই সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে দেওয়া হয় এবং মুনাফার ওপর আয়কর আইন অনুযায়ী উৎসে কর কর্তন করা হয়।

৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে কত মুনাফা পাওয়া যাবে

৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার নিচে ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে ১১.৮২ শতাংশ হার ধরে বছরে মোট মুনাফা দাঁড়ায় প্রায় ৫৯ হাজার ১০০ টাকা

অর্থাৎ প্রতি তিন মাসে মোট মুনাফা প্রায়:

৫৯,১০০ ÷ ৪ = ১৪,৭৭৫ টাকা।

তবে এই পুরো টাকা হাতে পাওয়া যাবে না। মুনাফার ওপর প্রযোজ্য উৎসে কর কর্তনের পর নিট মুনাফা কমে যাবে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরও জানিয়েছে, এ ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর আয়কর আইন-২০২৩-এর ১০৫ ধারা অনুযায়ী উৎসে কর কর্তন করা হয়।

মুনাফা দিয়ে DPS করলে কী হবে

ধরা যাক, সঞ্চয়পত্র থেকে কর কাটার পর প্রতি তিন মাসে প্রায় ১৪ হাজার টাকার মতো নিট মুনাফা পাওয়া গেল। সেই টাকা খরচ না করে প্রতি মাসে সমপরিমাণ অর্থ DPS-এ জমা করা হলে মূল ৫ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে অক্ষত থাকবে, আর মুনাফার টাকা আলাদা করে সুদসহ বাড়তে থাকবে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো—মূলধনের ওপর সঞ্চয়পত্রের মুনাফা এবং মুনাফার ওপর DPS-এর সুদ—দুই দিক থেকে অর্থ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।

তবে এটিকে সরাসরি চক্রবৃদ্ধি হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। কারণ ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মূল মেয়াদ মাত্র ৩ বছর। তাই ৩ বছর শেষে মূল ৫ লাখ টাকা কীভাবে পুনঃবিনিয়োগ করা হবে, তখনকার সঞ্চয়পত্রের হার কত থাকবে এবং মুনাফা কীভাবে নতুন করে বিনিয়োগ করা হবে—এসব বিষয় ৬ বছরের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে।

৬ বছরে ১০ লাখ করতে কী ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন

শুধু ৫ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে রেখে তার মুনাফা তুলে খরচ করলে ৬ বছরে দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং মুনাফার প্রতিটি কিস্তি নিয়মিত DPS-এ স্থানান্তর করতে হবে।

একটি উদাহরণ হিসেবে পরিকল্পনাটি এমন হতে পারে—

প্রথম ধাপ: ৫ লাখ টাকা ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ।

দ্বিতীয় ধাপ: প্রতি তিন মাসে পাওয়া নিট মুনাফা দিয়ে DPS-এর মাসিক কিস্তি পরিশোধ।

তৃতীয় ধাপ: মুনাফা কম হলে নিজের অর্থ থেকে সামান্য অতিরিক্ত টাকা যোগ করে DPS-এর কিস্তি পূরণ করা।

চতুর্থ ধাপ: DPS-এর মেয়াদ শেষে পাওয়া অর্থ পুনরায় নিরাপদ সুদভিত্তিক আমানত বা অন্য উপযুক্ত বিনিয়োগে রাখা।

পঞ্চম ধাপ: ৩ বছর শেষে সঞ্চয়পত্রের ৫ লাখ টাকা নতুন করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া।

এই পদ্ধতিতে মূল ৫ লাখ টাকা আলাদা থাকে এবং মুনাফা থেকে একটি দ্বিতীয় বিনিয়োগ তহবিল তৈরি হয়।

শুধু মুনাফা দিয়ে কি ১০ লাখ হবে?

এখানেই হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ৫ লাখ টাকা থেকে পাওয়া মুনাফা দিয়ে DPS চালালে কিছু বছর পর ভালো অঙ্কের অর্থ তৈরি হবে, কিন্তু বর্তমান হার অপরিবর্তিত থাকবে ধরে শুধু মুনাফা দিয়ে ৬ বছরে নিশ্চিতভাবে ১০ লাখ টাকা করা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

কারণ DPS-এর সুদের হার সঞ্চয়পত্রের হারের চেয়ে কম বা বেশি হতে পারে এবং এর ওপরও প্রযোজ্য কর থাকতে পারে। পাশাপাশি ৩ বছর পর সঞ্চয়পত্রের পুনঃবিনিয়োগের হার এখন থেকেই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তাই ১০ লাখ টাকার লক্ষ্যকে নিশ্চিত করতে চাইলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার পাশাপাশি প্রতি মাসে নিজের পক্ষ থেকে কিছু অতিরিক্ত অর্থ DPS-এ যোগ করা বেশি বাস্তবসম্মত।

একটি সম্ভাব্য কৌশল

উদাহরণ হিসেবে, সঞ্চয়পত্রের নিট মুনাফা দিয়ে যদি মাসে প্রায় ৪ হাজার ৫০০–৪ হাজার ৭০০ টাকার সমপরিমাণ DPS চালানো যায়, তাহলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য নিজের পক্ষ থেকে আরও প্রায় ১ হাজার ৮০০–২ হাজার টাকা মাসে যোগ করা যেতে পারে।

অর্থাৎ মাসিক DPS কিস্তি প্রায় ৬ হাজার ৫০০ টাকা হলে ৫ বছরের একটি DPS-এ মোট জমা এবং সুদের মাধ্যমে ৬ বছর শেষে ১০ লাখ টাকার লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এটি উদাহরণভিত্তিক আর্থিক হিসাব, নিশ্চিত রিটার্ন নয়। DPS-এর প্রকৃত সুদের হার, মুনাফার ওপর কর, কিস্তির সময় এবং মেয়াদ শেষে অর্থ কোথায় রাখা হচ্ছে—এসবের কারণে চূড়ান্ত অঙ্ক পরিবর্তিত হবে।

সঞ্চয়পত্রের একটি বড় সুবিধা

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র বিভিন্ন সরকারি ও অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেনা যায়। ব্যক্তির ক্ষেত্রে একক নামে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ এবং যুগ্ম নামে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত এই সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ রয়েছে।

এছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র—দুটিই বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় ব্যবস্থার বিদ্যমান স্কিমগুলোর মধ্যে রয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কতা

তবে ৬ বছরের পরিকল্পনা করার সময় একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে—আজকের মুনাফার হার আগামী ৬ বছর একই থাকবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

সঞ্চয়পত্রের হার পরিবর্তিত হতে পারে। ব্যাংকের DPS-এর সুদের হারও পরিবর্তিত হতে পারে। আবার করের নিয়মেও পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে আজকের হিসাবকে ভবিষ্যতের নিশ্চিত ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদ্ধতি হলো, ৫ লাখ টাকার মূলধন নিরাপদ বিনিয়োগে রেখে তার মুনাফা নিয়মিতভাবে পুনঃবিনিয়োগ করা এবং লক্ষ্য ১০ লাখ টাকা হলে প্রয়োজন অনুযায়ী সামান্য নিজস্ব অর্থ যোগ করা।

শেষ কথা

৫ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে রেখে মুনাফা খরচ না করে DPS-এ পুনঃবিনিয়োগ করলে ৬ বছরে অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু কর কর্তনের পর ৫ লাখ থেকে ঠিক ১০ লাখ টাকা করতে শুধু সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নাও হতে পারে।

বরং ৫ লাখ টাকা মূল বিনিয়োগ + প্রতি তিন মাসের নিট মুনাফা DPS-এ পুনঃবিনিয়োগ + প্রয়োজন হলে মাসে প্রায় ১,৮০০–২,০০০ টাকা অতিরিক্ত সঞ্চয়—এই কৌশল ১০ লাখ টাকার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত হতে পারে।

তবে বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর থেকে সর্বশেষ মুনাফার হার, উৎসে কর ও পুনঃবিনিয়োগের নিয়ম যাচাই করা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *