নবম পে-স্কেলে কর্মচারীদের বৈষম্য কমানোর দাবি, উচ্চতর গ্রেড ও পুরোনো সুবিধা ফেরানোর আহ্বান
নবম জাতীয় বেতন স্কেলকে ঘিরে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশা যেমন বাড়ছে, তেমনি বেতন কাঠামোর ভেতরে বৈষম্য কমানো এবং নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন বেতন কাঠামোয় শুধু মূল বেতন বাড়ালেই তাদের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হবে না; বরং পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, পেনশন, ঋণ ও বিভিন্ন ভাতার ক্ষেত্রেও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।
কর্মচারীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবির মধ্যে রয়েছে—বেতন ধাপের বৈষম্য কমানো, টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের মতো আর্থিক সুবিধা পুনর্বিবেচনা, শতভাগ পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করা, ব্লক পোস্টে দীর্ঘদিন পদোন্নতি না পাওয়া কর্মচারীদের নির্দিষ্ট সময় পর উচ্চতর গ্রেড দেওয়া এবং সহজ শর্তে গৃহনির্মাণ ঋণের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি চিকিৎসা, শিক্ষা, টিফিনসহ বিভিন্ন ভাতা বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানোর দাবিও রয়েছে।
শুধু বেতন বাড়ালেই বৈষম্য দূর হবে না
কর্মচারীদের বক্তব্যের মূল জায়গাটি হলো—বেতন কাঠামোর সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ স্তরের ব্যবধান এবং বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে আর্থিক সুবিধার পার্থক্য কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, সেটি নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার।
নবম পে-স্কেল নিয়ে আগে থেকেই কর্মচারী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন দাবিতে বৈষম্যহীন বেতন কাঠামো, টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল এবং ব্লক পোস্টে কর্মরতদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে পে-স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির বৈঠক সম্পর্কিত প্রতিবেদনে নিচের স্তরের কর্মচারীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর সুপারিশের কথাও প্রকাশিত হয়েছিল।
অর্থাৎ, কর্মচারীদের বর্তমান দাবিগুলো একেবারে নতুন কোনো বিষয় নয়; দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বেতন-সুবিধা ও পদোন্নতি কাঠামোর অসামঞ্জস্যের সঙ্গেই এগুলোর সম্পর্ক রয়েছে।
টাইমস্কেল-সিলেকশন গ্রেড কেন গুরুত্বপূর্ণ
কর্মচারীদের দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড। কারণ একই পদে দীর্ঘদিন কাজ করেও যদি পদোন্নতির সুযোগ না থাকে, তাহলে একজন কর্মচারীর আর্থিক অগ্রগতি অনেকাংশে আটকে যেতে পারে।
বর্তমান উচ্চতর গ্রেড সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একই পদে কর্মরত কর্মচারীদের ১০ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড এবং পরবর্তী ছয় বছর পদোন্নতি না হলে আরও একটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে আগে টাইমস্কেল বা সিলেকশন গ্রেড পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার নিয়মও নির্ধারিত হয়েছে।
সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সাম্প্রতিক অফিস আদেশেও ১০ বছর চাকরি পূর্তিতে কর্মচারীদের উচ্চতর বেতন গ্রেড দেওয়ার উদাহরণ রয়েছে।
এ কারণে কর্মচারীদের দাবি মূলত একটি বিষয়কে সামনে আনছে—পদোন্নতি না হলেও দীর্ঘ চাকরিজীবনে একজন কর্মচারীর বেতন যেন সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে না থাকে।
ব্লক পোস্টে ৫ বছর পর উচ্চতর গ্রেডের দাবি
কর্মচারীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো ব্লক পোস্টে কর্মরতদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেডের ব্যবস্থা করা।
যেসব পদে সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ সীমিত বা কার্যত অনুপস্থিত, সেখানে একজন কর্মচারী একই পদে বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ফলে একই দায়িত্ব পালন করেও অন্য পদে কর্মরত সহকর্মীদের তুলনায় আর্থিক অগ্রগতিতে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এ অবস্থায় পাঁচ বছর পূর্তির পর, অর্থাৎ ষষ্ঠ বছরে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার দাবি সামনে এসেছে। তবে এটি বর্তমানে সর্বজনীনভাবে কার্যকর সরকারি বিধান হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না; বরং এটি কর্মচারীদের একটি দাবি বা প্রস্তাব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। ২০২৬ সালের কর্মচারীদের দাবিসমূহের মধ্যেও ব্লক পোস্টে কর্মরতদের পদোন্নতি অথবা পাঁচ বছর পর উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিষয়টি ছিল।
শতভাগ পেনশন ও গ্র্যাচুইটির দাবিও সামনে
কর্মচারীদের আরেকটি বড় উদ্বেগ অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা। এ কারণে শতভাগ পেনশন এবং গ্র্যাচুইটির হার বৃদ্ধির দাবি করা হচ্ছে।
দীর্ঘ চাকরিজীবনের পর অবসরে একজন কর্মচারীর হাতে কী পরিমাণ অর্থ থাকবে এবং মাসিক পেনশন দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা সামাল দেওয়া সম্ভব—নতুন বেতন কাঠামোর আলোচনায় এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আগের বিভিন্ন কর্মচারী আন্দোলনের দাবিতেও পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও অবসর-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের কর্মচারী দাবির তালিকায় গ্র্যাচুইটির হার ১০০ শতাংশ করার দাবিও উল্লেখ করা হয়েছিল।
সহজ শর্তে গৃহনির্মাণ ঋণের দাবি
নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য আবাসন ব্যয় বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক চাপ। ফলে সহজ শর্তে গৃহনির্মাণ ঋণ, দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি এবং তুলনামূলক কম সুদের সুবিধা দেওয়ার দাবিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কর্মচারীদের যুক্তি হলো, বেতন বাড়লেও যদি বাড়িভাড়া, জমি, নির্মাণসামগ্রী ও চিকিৎসা ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা তেমন বাড়ে না। তাই শুধু মূল বেতন নয়, কর্মচারীর জীবনযাত্রার মৌলিক ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামগ্রিক সুবিধা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
চিকিৎসা, শিক্ষা ও টিফিন ভাতা বাড়ানোর দাবি
কর্মচারীদের বক্তব্যে চিকিৎসা, শিক্ষা, টিফিনসহ বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট অঙ্কে থাকা ভাতা বর্তমান বাজারদর ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভাতা পুনর্নির্ধারণ না হলে প্রকৃত আয় বৃদ্ধির সুফল অনেকাংশে কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মাসিক আয়ের বড় অংশ নিয়ে নেয়। ফলে নতুন পে-স্কেলে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে এসব ভাতা পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি কর্মচারীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘সব কাজ অফিসাররা করুক’—এমন বক্তব্য কেন আলোচনায়
কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের মাত্রা বোঝাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে—তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সব কর্মচারী যদি কাজ বন্ধ করে দেন এবং অফিসারদের দিয়েই সব কাজ করানো হয়, তাহলে কর্মচারীদের গুরুত্ব বোঝা যাবে এবং পে-স্কেলের দাবিও দ্রুত বাস্তবায়িত হবে।
তবে এ ধরনের বক্তব্যকে আক্ষরিকভাবে কর্মবিরতির আহ্বান হিসেবে না দেখে কর্মচারীদের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। সরকারি সেবা সচল রাখা এবং নাগরিকদের ভোগান্তি এড়ানো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করাও প্রশাসনের দায়িত্ব।
অতীতেও পে-স্কেলসহ বিভিন্ন দাবিতে সরকারি কর্মচারীরা কর্মসূচি পালন করেছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৫০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা ও নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে কর্মচারীদের কর্মসূচিতে পুলিশি বাধার ঘটনাও সংবাদে এসেছিল।
নিচের গ্রেডকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রশ্ন
নবম পে-স্কেলের অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—বেতন বৃদ্ধির সুবিধা কোন স্তরে কতটা দেওয়া হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় সরকার নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়। একই সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে নতুন কাঠামোর সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুপারিশের কথাও আসে।
এর ফলে কর্মচারীদের প্রত্যাশা এখন শুধু নতুন বেতন পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা চাইছেন, নতুন কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার অগ্রগতি এবং অবসর-পরবর্তী নিরাপত্তার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হোক।
কর্মচারীদের দাবির সারকথা
সব মিলিয়ে কর্মচারীদের দাবিগুলোকে কয়েকটি মূল বিষয়ের মধ্যে সাজানো যায়—
- গ্রেডগুলোর মধ্যে বেতন বৈষম্য যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা;
- টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের সুবিধা পুনর্বিবেচনা বা বিকল্প ব্যবস্থা চালু;
- পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মচারীদের নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয় উচ্চতর গ্রেড;
- ব্লক পোস্টে পাঁচ বছর পূর্তির পর উচ্চতর গ্রেডের ব্যবস্থা;
- শতভাগ পেনশন ও গ্র্যাচুইটির সুবিধা নিশ্চিত করা;
- সহজ শর্তে গৃহনির্মাণ ঋণ;
- চিকিৎসা, শিক্ষা, টিফিন ও অন্যান্য ভাতা বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয়;
- তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আর্থিক অগ্রগতির জন্য পৃথক গুরুত্ব দেওয়া;
- পদোন্নতির সুযোগ সীমিত এমন পদে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
শেষ কথা
নবম পে-স্কেলকে ঘিরে মূল প্রত্যাশা তাই শুধু ‘বেতন কত বাড়বে’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, নতুন কাঠামোটি কতটা বৈষম্য কমাবে এবং দীর্ঘ চাকরিজীবনে একজন কর্মচারীকে কতটা আর্থিক নিরাপত্তা দেবে।
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বড় একটি অংশের যুক্তি হলো, তারা প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমের অপরিহার্য অংশ। তাদের দায়িত্বের স্বীকৃতি যদি শুধু কথায় নয়, বরং বেতন, উচ্চতর গ্রেড, পদোন্নতি, পেনশন, ঋণ ও ভাতার কাঠামোতেও প্রতিফলিত হয়, তাহলেই নতুন পে-স্কেলকে তারা সত্যিকার অর্থে বৈষম্যহীন ও কর্মীবান্ধব বেতন কাঠামো হিসেবে গ্রহণ করবেন।
অন্যদিকে, ‘সব কর্মচারী কাজ বন্ধ করে দিলে পে-স্কেল হয়ে যাবে’—এ ধরনের বক্তব্যের পরিবর্তে বাস্তবসম্মত, লিখিত ও বিধিসম্মত দাবি এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর। কারণ একটি টেকসই পে-স্কেলের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু বেতন বৃদ্ধির ওপর নয়; বরং গ্রেড কাঠামো, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, পেনশন ও ভাতার মধ্যে সামগ্রিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ওপর।

