৯ম পে স্কেল নিউজ

নতুন পে-স্কেল নিয়ে বড় অগ্রগতি: ২০ গ্রেডে সর্বোচ্চ ১০০% মূল বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ, বাস্তবায়ন হতে পারে দুই ধাপে

সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ প্রণয়নে গঠিত উচ্চপর্যায়ের ১০ সদস্যের সচিব কমিটি ইতোমধ্যে তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে। প্রস্তাবে ১ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব রয়েছে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন এখনো জারি হয়নি। ফলে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত গ্রেডভিত্তিক বেতনের অঙ্কগুলোকে এই মুহূর্তে চূড়ান্ত সরকারি বেতন কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির পরই চূড়ান্ত কাঠামো নিশ্চিত হবে।

২১ এপ্রিল গঠিত হয় ১০ সদস্যের সচিব কমিটি

নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথনকশা ও সুপারিশ চূড়ান্ত করতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষাসচিব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রকসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা রয়েছেন।

এই কমিটির মূল দায়িত্ব ছিল জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকারের জন্য একটি বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করা।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, কমিটির সদস্যরা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। অর্থাৎ, দীর্ঘ আলোচনার পর সুপারিশ প্রণয়নের কাজ গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে।


মূল বেতন বাড়বে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত

সচিব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের ১ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—সব গ্রেডে একই হারে বেতন বাড়বে, এমন কথা বলা হয়নি। “সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ” অর্থ হলো, গ্রেডভেদে বৃদ্ধির হার ও বেতন কাঠামোয় পার্থক্য থাকতে পারে।

নবম বেতন কমিশনের মূল সুপারিশে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার কথা বলা হয়েছিল। কমিশন তখন মোট বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। তবে পরবর্তী পর্যায়ে সচিব কমিটির বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় মূল বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশের বিষয়টি সামনে এসেছে।


বাস্তবায়ন হবে দুই ধাপে

নতুন পে-স্কেল নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো এর ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী—

প্রথম ধাপ

প্রথম বছরে কার্যকর হতে পারে নতুন মূল বেতন

দ্বিতীয় ধাপ

পরবর্তী বছরে কার্যকর হতে পারে—

  • বাড়িভাড়া ভাতা;
  • চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রযোজ্য ভাতা;
  • সংশোধিত বা পুনর্নির্ধারিত অন্যান্য আর্থিক সুবিধা।

অর্থাৎ, প্রজ্ঞাপন জারি হলেই সব ধরনের আর্থিক সুবিধা একই দিনে পুরোপুরি কার্যকর হবে—এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই। বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী মূল বেতন ও ভাতার অংশ আলাদা সময়ে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে


গ্রেডভিত্তিক যে সম্ভাব্য বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সম্ভাব্য বা প্রস্তাবিত গ্রেডভিত্তিক কাঠামোয় যে অঙ্কগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো হলো—

গ্রেড আলোচিত/প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো
১ম গ্রেড ১,৬০,০০০ টাকা (নির্ধারিত)
২য় গ্রেড ১,৩২,০০০–১,৫৩,০০০ টাকা
৩য় গ্রেড ১,১৩,০০০–১,৪৮,৮০০ টাকা
৪র্থ গ্রেড ১,০০,০০০–১,৪২,৪০০ টাকা
৫ম গ্রেড ৮৬,০০০–১,৩৯,৭০০ টাকা
৬ষ্ঠ গ্রেড ৭১,০০০–১,৩৪,০০০ টাকা
৭ম গ্রেড ৫৮,০০০–১,২৬,৮০০ টাকা
৮ম গ্রেড ৪৭,২০০–১,১৩,৭০০ টাকা
৯ম গ্রেড ৪৫,১০০–১,০৮,৮০০ টাকা
১০ম গ্রেড ৩২,০০০–৭৭,৩০০ টাকা
১১তম গ্রেড ২৫,০০০–৬০,৫০০ টাকা
১২তম গ্রেড ২৪,৩০০–৫৮,৭০০ টাকা
১৩তম গ্রেড ২৪,০০০–৫৮,০০০ টাকা
১৪তম গ্রেড ২৩,৫০০–৫৬,৮০০ টাকা
১৫তম গ্রেড ২২,৮০০–৫৫,২০০ টাকা
১৬তম গ্রেড ২১,৯০০–৫২,৯০০ টাকা
১৭তম গ্রেড ২১,৪০০–৫১,৯০০ টাকা
১৮তম গ্রেড ২১,০০০–৫০,৯০০ টাকা
১৯তম গ্রেড ২০,৫০০–৪৯,৬০০ টাকা
২০তম গ্রেড ২০,০০০–৪৮,৪০০ টাকা

বিশেষ সতর্কতা: এই তালিকাটি এখনো সরকারি প্রজ্ঞাপনে প্রকাশিত চূড়ান্ত বেতন কাঠামো নয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে এটিকে প্রস্তাবিত বা সম্ভাব্য কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে অঙ্ক বা বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন হতে পারে।


সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার প্রস্তাব

নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত দুটি অঙ্ক হলো—

  • ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন: ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা
  • ১ম গ্রেডের সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন: ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা

এ দুটি অঙ্ক দীর্ঘদিন ধরেই নতুন পে-স্কেল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তবে সচিব কমিটির বাস্তবায়ন সুপারিশ এবং চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদনের পর কোন কাঠামো হুবহু কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


কেন দুই ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা?

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন সরকারের জন্য একটি বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত। কারণ শুধু মাসিক বেতন বাড়লেই সরকারি ব্যয় বাড়ে না; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে—

  • বাড়িভাড়া ভাতা;
  • চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা;
  • পেনশন;
  • গ্র্যাচুইটি;
  • ভবিষ্যৎ আর্থিক দায়।

সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট বরাদ্দের পরিমাণ ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা

এই বিপুল আর্থিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে মূল বেতন আগে এবং ভাতার অংশ পরে কার্যকর করার পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের একটি ধাপভিত্তিক পদ্ধতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।


প্রায় ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেলের অপেক্ষা

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয় ২০১৫ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল কার্যকর হয়নি।

এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন সংগঠন ও কর্মচারীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জোরালো হওয়ার অন্যতম কারণও এটি।

নতুন কাঠামো নিয়ে সরকার ধাপে ধাপে এগোচ্ছে এবং বিষয়টি এখন নীতিগত সিদ্ধান্ত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।


মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে প্রস্তাব

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে আরও বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভার অনুমোদন মিললে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তুতি রয়েছে।

তবে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা চূড়ান্ত খসড়ায় বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির নির্দিষ্ট হার নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি। ফলে মন্ত্রিসভার অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত কোনো গ্রেডের নির্দিষ্ট বেতনকে চূড়ান্ত বলা যাচ্ছে না


বিশ্লেষণ: এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়

নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের সামনে এখন মূলত তিনটি প্রশ্ন—

১. মন্ত্রিসভা কবে অনুমোদন দেবে?

সচিব কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার পর এখন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রক্রিয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

২. প্রথম ধাপে কোন কোন সুবিধা কার্যকর হবে?

বর্তমান আলোচনায় প্রথম বছরে মূল বেতন কার্যকরের কথা থাকলেও চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে এর কার্যকর তারিখ ও বিস্তারিত পদ্ধতি স্পষ্ট হবে।

৩. গ্রেডভিত্তিক বেতন তালিকা কতটা পরিবর্তিত হতে পারে?

প্রকাশিত বিভিন্ন তালিকা নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে কোনো তালিকাই শতভাগ নিশ্চিত নয়


শেষ কথা

নতুন পে-স্কেল নিয়ে অপেক্ষার প্রহর এখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেই মনে হচ্ছে। ১০ সদস্যের সচিব কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়া, সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ এবং দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথ অনেকটাই এগিয়েছে।

তবে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—সোশ্যাল মিডিয়া বা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত গ্রেডভিত্তিক বেতন তালিকাকে এখনই চূড়ান্ত ধরে নেওয়া যাবে না। মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির পরই নতুন পে-স্কেলের প্রকৃত ও কার্যকর বেতন কাঠামো নিশ্চিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *