অর্ধেকের বেশি পরিবার আর্থিক চাপে ২০২৬ । ৯ম-২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের নাভিশ্বাস, নতুন পে-স্কেল এখন সময়ের দাবি?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) প্রকাশিত ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস) ২০২৫’-এর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার এক কঠিন বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছে। প্রতিবেদনের ‘আয় দিয়ে মৌলিক ব্যয় নির্বাহের সক্ষমতা’ সূচকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৪৮.৩৯% পরিবার তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে প্রশ্ন উঠেছে—দেশের কয়েক লক্ষ সরকারি কর্মচারী, বিশেষ করে ৯ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা এই তালিকার কোন অংশে অবস্থান করছেন?
জরিপের ভয়াবহ চিত্র: সংকটে দেশের অর্ধেক পরিবার
বিবিএস-এর তথ্যমতে, দেশের মাত্র ৬.৩৪% পরিবার ‘খুব সহজে’ এবং ১৬.৩৬% পরিবার ‘সহজে’ জীবন ধারণ করতে পারছে। অর্থাৎ মাত্র ২২.৭০% মানুষ আর্থিক সচ্ছলতার মধ্যে রয়েছে। বিপরীতে, ২৮.৮১% পরিবার ‘কিছুটা কষ্টে’, ১৪.০৫% পরিবার ‘কষ্টে’ এবং ৫.৫৩% পরিবার ‘খুব কষ্টে’ দিনাতিপাত করছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৮.৩৯% পরিবার বা দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী চরম আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে।
৯ম-২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অবস্থান কোথায়?
বাজারের ঊর্ধ্বগতি এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতির এই যুগে সরকারি কর্মচারীদের বর্তমান বেতন কাঠামো দিয়ে মাস চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ৯ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বড় একটি অংশই ওই ৪৮% জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে যারা ‘কষ্টে’ বা ‘খুব কষ্টে’ জীবন পার করছেন।
২০১৫ সালের সর্বশেষ পে-স্কেলের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়নি। নামমাত্র ইনক্রিমেন্ট দিয়ে আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্যের সাথে পাল্লা দেওয়া এই শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য এখন বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই। নীতিনির্ধারকদের কাছে সাধারণ কর্মচারীদের প্রশ্ন—একজন নিম্ন বা মধ্যম সারির কর্মচারী কি বর্তমান বেতন দিয়ে ওই সচ্ছল ২৩%-এর কাতারে থাকার স্বপ্ন দেখতে পারেন? উত্তরটি স্পষ্টতই নেতিবাচক।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ঝুঁকি
প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, যদি দ্রুত আয় বৃদ্ধিমুখী নীতি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে এই আর্থিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলবে। বিশেষ করে যারা দেশের সেবায় নিয়োজিত, সেই বিশাল সংখ্যক সরকারি জনবল যদি আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক সুশাসনে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের দাবি
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের দাবি, নতুন সরকারের উচিত হবে কোনো কালক্ষেপণ না করে:
-
পে-কমিশন বাস্তবায়ন: প্রস্তাবিত পে-স্কেল দ্রুত বিচার-বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়ন করা।
-
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।
-
বেকারত্ব নিরসন: দেশে প্রকট আকার ধারণ করা বেকার সমস্যা সমাধানে দ্রুত বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
পরিশেষে, পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই তথ্য কেবল সংখ্যা নয়, এটি সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের আর্তনাদ। সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে এবং দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে একটি সময়োপযোগী ও যৌক্তিক পে-স্কেল বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


