সরকারি কর্মচারীদের পার্সোনাল লোনের মেয়াদ বেড়ে ৮ বছর: স্বস্তির মাঝেও ১৩-১৪% সুদের নির্মম ক্ষত
সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জরুরি ব্যক্তিগত আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে পার্সোনাল লোনের (ব্যক্তিগত ঋণ) পরিশোধের মেয়াদ পুনরায় সর্বোচ্চ ৮ বছর বা চাকুরির মেয়াদকাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মেয়াদের এই বৃদ্ধিতে মাসিক কিস্তির পরিমাণ কম হওয়ায় সাময়িক স্বস্তি এলেও, ঋণের আকাশচুম্বী সুদের হার নিয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে চাকুরিজীবীদের মাঝে। বর্তমানে বাজারভিত্তিক সুদের হার নীতির কারণে এই লোনের ইন্টারেস্ট রেট দাঁড়িয়েছে ১৩% থেকে ১৪% বা তারও বেশি। চাকুরিজীবীদের স্পষ্ট দাবি—লোনের মেয়াদ বাড়ানোর চেয়ে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে (যেমন ৯%) নামিয়ে আনাটা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি ছিল।
মেয়াদের স্বস্তি বনাম সুদের অস্বস্তি: আসল চিত্রটা কোথায়?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ও তফসিলি ব্যাংকগুলো সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কর্মচারীদের জন্য ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ব্যক্তিগত ঋণের মেয়াদ ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে আবার ৮ বছর করার সুযোগ পাচ্ছে।
মেয়াদ বাড়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রতি মাসের ইএমআই (EMI) বা কিস্তির ওপর চাপ কিছুটা কমবে। কিন্তু মুদ্রার ওপিঠ বলছে অন্য কথা। মেয়াদ বাড়ার অর্থ হলো—দীর্ঘ সময় ধরে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ গুনে যাওয়া। ১৩-১৪% এর মতো উচ্চ সুদে ৮ বছর ধরে একটি ঋণের কিস্তি টানতে গেলে মূল টাকার প্রায় কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি টাকা শুধু সুদ হিসেবেই পকেট থেকে চলে যাবে।
একটি বাস্তবমুখী তুলনা লক্ষ্য করা যাক:
যদি একজন কর্মচারী ১৩% সুদে ১০ লক্ষ টাকা পার্সোনাল লোন নেন, তবে ৫ বছর বনাম ৮ বছর মেয়াদে তার মোট পরিশোধের চিত্রটি কেমন দাঁড়াবে?
| বিষয়ের তুলনামূলক চিত্র | ৫ বছর মেয়াদে (৬০ মাস) | ৮ বছর মেয়াদে (৯৬ মাস) |
| মাসিক আনুমানিক কিস্তি | ~২২,৭৫০ টাকা | ~১৬,৮০০ টাকা |
| ৮ বছরে মোট পরিশোধ | ~১৩,৬৫,০০০ টাকা | ~১৬,১২,৮০০ টাকা |
| শুধু সুদের পরিমাণ | ~৩,৬৫,০০০ টাকা | ~৬,১২,৮০০ টাকা |
বিশ্লেষণ: ৮ বছর মেয়াদ করায় মাসিক কিস্তি প্রায় ৬ হাজার টাকা কমলেও, গ্রাহককে শুধু সুদ বাবদ অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে প্রায় ২ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা! অর্থাৎ, মেয়াদ বাড়লে ব্যাংকের লাভ বাড়লেও চাকুরিজীবীর পকেট আরও বেশি খালি হচ্ছে।
৯% সুদ কেন করা গেল না?
বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছর থেকে সুদের হারের ওপর থাকা ৯% ক্যাপ বা সর্বোচ্চ সীমা তুলে দিয়ে ‘আইবিএআর’ (SMART/Market-driven) ভিত্তিক ও পরবর্তীতে সম্পূর্ণ বাজারভিত্তিক সুদ নীতি চালুর পর থেকে ঋণের সুদ হু হু করে বাড়ছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি বা লাগামহীন বাজার দর নিয়ন্ত্রণ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। ফলে আমানতের সুদের হার বাড়ার সাথে সাথে ঋণের সুদের হারও ১৩% থেকে ১৪% ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ঢালাওভাবে পার্সোনাল লোনে ৯% সুদ কার্যকর করা ব্যাংকের বাণিজ্যিক দিক থেকে কঠিন। তবে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিশেষ বিবেচনায় কোনো “সাবসিডি” বা বিশেষ প্রণোদনা স্কিম না থাকলে এই উচ্চ সুদের ফাঁদ থেকে তাদের বের করা সম্ভব নয়।
“লোন করতে করতে জীবন শেষ”—চাকরিজীবীদের আর্তনাদ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মেয়াদ ৫ বছর থেকে ৮ বছর করায় হয়তো মাস শেষে কিস্তির চাপ কমবে, কিন্তু ব্যাংকের পেছনেই তো জীবনের সিংহভাগ আয় চলে যাবে। বেতন যে হারে বাড়ে, তার চেয়ে চারগুণ হারে বাড়ে বাজারের খরচ। সন্তান চাওয়া, চিকিৎসা কিংবা পারিবারিক যেকোনো সংকটে লোন নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আর লোন নিলে সেই লোন শোধ করতে করতেই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
সাধারণ কর্মচারীদের দাবি, সরকার যেখানে ৫% সরল সুদে সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য বিশেষ গৃহনির্মাণ ঋণের (সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত) ব্যবস্থা করতে পেরেছে, সেখানে আপদকালীন ব্যক্তিগত প্রয়োজন বা চিকিৎসার জন্য পার্সোনাল লোনের সুদের হার কেন ৯% বা তার নিচে নামিয়ে আনা যাবে না?
শেষ কথা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মেয়াদ বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্তকে চাকুরিজীবীরা এক ধরণের ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবেই দেখছেন। কিস্তির টাকা কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে ঋণের দাসত্বে আটকে থাকছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত কর্মচারীরা। চাকুরিজীবীদের জীবনকে সহজ করতে এবং ঋণের বোঝা থেকে কিছুটা রেহাই দিতে পার্সোনাল লোনের সুদের হার পুনর্বিবেচনা করে একটি সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য সরকারের নীতি-নির্ধারকদের সুদৃষ্টি কামনা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।

