Latest News

স্বস্তি ও করের টানাপোড়েন: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কার পকেট হালকা, কার ভারী?

উন্নত ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল আকারের এক প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে অনুমোদনের পর আজ বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ৫৫তম বাজেটটি উত্থাপন করা হয়। এটি বর্তমান সরকারের এই মেয়াদের প্রথম বাজেট।

এবারের বাজেটে একদিকে তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং শিশুখাদ্যে বড় ধরনের শুল্ক-কর ছাড় দিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে; অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিলাসী পণ্য, গাড়ি, আবাসন খাত এবং তামাকজাত পণ্যের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো হয়েছে। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক নতুন বাজেটের প্রভাবে কোন কোন পণ্যের দাম কমছে এবং কোনগুলোর দাম বাড়ছে।

📉 দাম কমছে যেসব পণ্যের

প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাস এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে:

  • তথ্যপ্রযুক্তি ও শিক্ষা খাত: আইটি খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও ডিজিটাল রূপান্তর গতিশীল করতে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, প্রিন্টার ও মনিটর আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে প্রযুক্তি পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।

  • চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা: স্বাস্থ্য খাতে সাধারণ মানুষের খরচ কমাতে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর আগাম কর প্রত্যাহারের ফলে প্রতি সেশনে প্রায় ৮০০ টাকা খরচ কমবে। এ ছাড়া হার্টের রিং ও চোখের লেন্সের ওপর থেকে ভ্যাট তুলে নেওয়ায় হার্টের রিংয়ের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। পাশাপাশি ক্যান্সারের ওষুধ এবং ওষুধের ৬৮টি কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে।

  • নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শিশুখাদ্য: শিশুখাদ্য তৈরির কাঁচামালে শুল্ক কমানোর কারণে গুঁড়ো দুধসহ বিভিন্ন শিশুখাদ্যের দাম কমবে। এ ছাড়া চাল, গম, আলু, পেঁয়াজসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের উৎসে কর কমিয়ে ০.৫% করা হয়েছে। মসলাজাতীয় পণ্য যেমন—দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ এবং খেজুর আমদানির ওপর থেকে রেগুলেটরি শুল্ক তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

  • পরিবেশবান্ধব পরিবহন ও জ্বালানি: পরিবেশবান্ধব যাতায়াত উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) ও হাইব্রিড গাড়ির ওপর করভার এবং ইভি চার্জিং স্টেশনের কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি টেকসই শক্তি নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ (Solar) খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ কর হার বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

📈 দাম বাড়ছে যেসব পণ্যের

রাজস্ব ঘাটতি পূরণ এবং বিলাসবহুল জীবনযাত্রাকে নিরুৎসাহিত করতে বেশ কিছু পণ্যের ওপর করের হার বাড়ানো হয়েছে:

  • তামাক ও মদ: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে সিগারেটের চারটি স্তরেই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। ১০ শলাকার নিম্নস্তরের প্যাকেটের দাম ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬২ টাকা এবং অতি-উচ্চ বা প্রিমিয়াম স্তরের দাম ১৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১০ টাকা করা হচ্ছে। এ ছাড়া দেশে উৎপাদিত মদের ওপর লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

  • আবাসন ও নির্মাণ সামগ্রী: নতুন অর্থবছরে বাড়ি তৈরির খরচ বাড়বে। বাড়ি নির্মাণের প্রধান উপাদান এমএস রড ও ইস্পাতজাত পণ্যের ওপর ভ্যাট ও কর প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

  • বিলাসবহুল গাড়ি ও হেলিকপ্টার: ১২०० থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার বিলাসবহুল গাড়ির সামগ্রিক কর বৃদ্ধি ও অগ্রিম আয়কর দ্বিগুণ করার প্রস্তাব এসেছে। উচ্চবিত্তদের ব্যবহৃত হেলিকপ্টারের ওপরও বার্ষিক অগ্রিম আয়কর বাড়ানো হচ্ছে।

  • আমদানিকৃত খাদ্য ও ফল: দেশীয় চাষীদের সুরক্ষায় আমদানিকৃত কাজুবাদামের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে একলাফে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চমূল্যের বিদেশি হিমায়িত মাছ ও পাঙাশ ফিশ ফিলেটের ওপর যথাক্রমে ১৫% ও ২০% ভ্যাট-শুল্ক আরোপ করায় এগুলোর দাম বাড়বে।

💡 অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি, চিকিৎসা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো প্রগতিশীল খাতগুলোতে শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক, যা মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষকে সরাসরি সুবিধা দেবে। তবে বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা হওয়ায় তা মেটানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। একই সাথে বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর তদারকি না থাকলে কর ছাড়ের এই সুফল সাধারণ ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানো কঠিন হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *