একই দেশ, একই যোগ্যতা—পদোন্নতিতে কেন এত বৈষম্য? সচিবালয়ে ১৬তম গ্রেড থেকে সরাসরি ১০ম গ্রেডে পদোন্নতি ঘিরে প্রশ্ন
সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি, পদোন্নতির সুযোগ এবং ক্যারিয়ার অগ্রগতির ক্ষেত্রে দপ্তরভেদে বিদ্যমান বৈষম্য আবারও আলোচনায় এসেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের একটি প্রজ্ঞাপনে তিনজন কর্মচারীকে জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫-এর ১৬,০০০–৩৮,৬৪০ টাকা বেতনক্রমের ১০ম গ্রেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়ার তথ্য সামনে আসার পর বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—একই রাষ্ট্রের কর্মচারী হয়েও পদোন্নতির সুযোগে এত বড় পার্থক্য কেন?
গত ৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের প্রশাসন-১ (সংস্থাপন) শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশ সচিবালয় (ক্যাডার বহির্ভূত গেজেটেড কর্মকর্তা এবং নন-গেজেটেড কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৪ (সংশোধিত-২০২০) অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয়ের একটি স্মারকের মাধ্যমে দেওয়া সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের তিনজন কর্মচারীকে ১০ম গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, পদোন্নতিপ্রাপ্ত তিনজনই অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজনকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং দুজনকে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদগুলোর বেতনক্রম জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫ অনুযায়ী ১৬,০০০–৩৮,৬৪০ টাকা, অর্থাৎ ১০ম গ্রেড।
নিম্ন গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ
প্রজ্ঞাপনটি ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সচিবালয়ের কর্মচারীদের ক্যারিয়ার অগ্রগতির সুযোগ নিয়ে। অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদ সাধারণভাবে ১৬তম গ্রেডভুক্ত একটি পদ। অথচ সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিধিমালার শর্ত পূরণ, বিভাগীয় প্রক্রিয়া এবং সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এই পদে কর্মরত কর্মচারীরা সরাসরি ১০ম গ্রেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে পদোন্নতির সুযোগ পাচ্ছেন।
অর্থাৎ পদোন্নতির ক্ষেত্রে এক ধাপে ছয় গ্রেড অতিক্রম করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে সচিবালয়ের বাইরে বিভিন্ন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং মাঠ প্রশাসনের অনেক কর্মচারীর অভিযোগ, একই শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সমমানের পদে চাকরিতে প্রবেশ করেও তাঁদের ক্যারিয়ার অগ্রগতির সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
অনেক প্রতিষ্ঠানে ১৬তম গ্রেডে চাকরিতে প্রবেশের পর ১৪তম বা ১৩তম গ্রেডের উচ্চতর পদে পদোন্নতি পেতেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কোথাও পদোন্নতির পদসংখ্যা অত্যন্ত সীমিত, কোথাও নিয়োগ বিধিমালায় পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত, আবার কোথাও দীর্ঘদিন নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন না হওয়ায় কর্মচারীরা একই পদে বছরের পর বছর কর্মরত থাকছেন।
একই রাষ্ট্রের কর্মচারী, কিন্তু ক্যারিয়ার কাঠামো ভিন্ন
সরকারি চাকরির ব্যবস্থাপনায় মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সংস্থাভেদে পৃথক নিয়োগ বিধিমালা রয়েছে। এসব বিধিমালায় পদোন্নতির যোগ্যতা, ফিডার পদ, চাকরিকালের অভিজ্ঞতা, বিভাগীয় পরীক্ষা এবং পদোন্নতির কোটাসহ বিভিন্ন শর্ত নির্ধারণ করা হয়।
ফলে একই শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কাছাকাছি ধরনের দায়িত্ব পালন করলেও একজন কর্মচারীর ক্যারিয়ার অগ্রগতির সুযোগ নির্ভর করছে তিনি কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন তার ওপর।
সচিবালয়ে কর্মরত নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মচারীরা প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে পদোন্নতির সুযোগ পেলেও সচিবালয়ের বাইরের অনেক প্রতিষ্ঠানে সমমানের কর্মচারীদের জন্য একই ধরনের ক্যারিয়ার পথ নেই।
এই বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন ও চাকরিজীবীদের আলোচনায় রয়েছে।
পদোন্নতি না উচ্চতর গ্রেড—দুই ব্যবস্থার পার্থক্য
সরকারি চাকরিতে নির্ধারিত সময় চাকরি করার পর অনেক কর্মচারী উচ্চতর গ্রেড বা আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু উচ্চতর গ্রেড পাওয়া এবং প্রকৃত পদোন্নতি এক বিষয় নয়।
উচ্চতর গ্রেডে একজন কর্মচারীর বেতন বাড়লেও তাঁর পদবি, প্রশাসনিক ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং পরবর্তী পদোন্নতির সুযোগ সাধারণত পরিবর্তিত হয় না।
অন্যদিকে প্রকৃত পদোন্নতির মাধ্যমে একজন কর্মচারী উচ্চতর পদে নিয়োগ পান। এতে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন পদমর্যাদা, দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতে আরও উচ্চ পদে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই কারণে সচিবালয়ে নিম্ন গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা পদে পদোন্নতির সুযোগকে বড় ধরনের ক্যারিয়ার সুবিধা হিসেবে দেখছেন সচিবালয়ের বাইরের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারীরা।
বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা
সরকারি চাকরিজীবীদের একটি অংশের মতে, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক নিয়োগ বিধিমালা থাকা স্বাভাবিক। তবে একই ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দায়িত্ব ও চাকরির প্রকৃতি থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতির সুযোগে অত্যধিক ব্যবধান থাকলে কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বিশেষ করে যেসব কর্মচারী ১৫ থেকে ২০ বছর চাকরি করেও এক বা দুই ধাপের বেশি পদোন্নতি পান না, তাঁদের কাছে সচিবালয়ের কর্মচারীদের কয়েক গ্রেড অতিক্রম করে কর্মকর্তা পদে যাওয়ার সুযোগ প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
তাঁদের প্রশ্ন—একই সরকারের অধীনে চাকরি করে একজন কর্মচারী যদি নিয়োগ বিধিমালার কারণে ১৬তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ পান, তাহলে একই যোগ্যতা ও সমমানের দায়িত্ব পালনকারী অন্য দপ্তরের কর্মচারীদের জন্য কেন সমতাভিত্তিক ক্যারিয়ার কাঠামো থাকবে না?
নিয়োগ বিধিমালা সংস্কারের দাবি
সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যাটির সমাধান সচিবালয়ের কর্মচারীদের বিদ্যমান পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত করা নয়। বরং যেসব সরকারি দপ্তর ও সংস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির সুযোগ সীমিত, সেসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিধিমালা পর্যালোচনা ও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন।
প্রতিটি পদের জন্য বাস্তবসম্মত ক্যারিয়ার পাথ নির্ধারণ, পর্যাপ্ত পদোন্নতির পদ সৃষ্টি, অভিন্ন বা সামঞ্জস্যপূর্ণ পদোন্নতি নীতিমালা প্রণয়ন এবং দীর্ঘদিন একই পদে কর্মরত কর্মচারীদের জন্য কার্যকর ক্যারিয়ার উন্নয়ন ব্যবস্থা চালুর দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
একই সঙ্গে কর্মচারীদের দায়িত্ব, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং চাকরির প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরভেদে পদোন্নতির সুযোগে অস্বাভাবিক ব্যবধান কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় প্রশ্ন
সরকারি চাকরিতে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে পদোন্নতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পদোন্নতির সুযোগ যদি কর্মদক্ষতার চেয়ে কর্মস্থল বা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিধিমালার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনটি তাই শুধু তিনজন কর্মচারীর পদোন্নতির ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান ভিন্ন ভিন্ন ক্যারিয়ার কাঠামো এবং পদোন্নতির সুযোগের বৈষম্য নিয়ে বড় ধরনের আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—সরকার কি সচিবালয়ের বিদ্যমান পদোন্নতির সুযোগ অক্ষুণ্ন রেখে অন্যান্য সরকারি দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থার কর্মচারীদের জন্যও যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে সমতাভিত্তিক এবং কার্যকর ক্যারিয়ার অগ্রগতির পথ তৈরি করবে?
সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশের প্রত্যাশা, আসন্ন প্রশাসনিক সংস্কার ও নিয়োগ বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। কারণ রাষ্ট্রের কর্মচারীদের মধ্যে ন্যায্য পদোন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করা শুধু বেতন বা পদমর্যাদার প্রশ্ন নয়; এটি প্রশাসনে কর্মস্পৃহা, দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

