এক ধাপে নাকি ধাপে ধাপে? নবম পে-স্কেলে ‘ফিক্সেশন’ বিতর্কে ক্ষোভ সরকারি কর্মচারীদের
প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ‘প্রথম ধাপে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি’ সংক্রান্ত ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের দাবি, বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশন সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছাড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক আলোচনায় একজন সরকারি কর্মকর্তা উদাহরণ দিয়ে দেখান, নবম পে-স্কেলে ৯ম গ্রেডের বর্তমান মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে ৩৩ হাজার টাকায় উন্নীত হওয়ার যে হিসাব দেখানো হচ্ছে, তা বাস্তবে ফিক্সেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কী নিয়ে প্রশ্ন?
বর্তমান অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে ৯ম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২২ হাজার টাকা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কার্যকর হলে তা ৩৩ হাজার টাকায় উন্নীত হবে।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একজন কর্মচারীর প্রকৃত মূল বেতন কেবল প্রারম্ভিক স্কেলের ওপর নির্ভর করে না; চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট যোগ হয়ে বেতন অনেক বেশি হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে একজন কর্মকর্তা জানান, তার বর্তমান মূল বেতন ৪১ হাজার ৫৫০ টাকা। অর্থাৎ ২২ হাজার টাকার প্রারম্ভিক স্কেল থেকে দীর্ঘ চাকরিজীবনের কারণে তার মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের সময় কেবল ২২ হাজার টাকার ওপর ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি গণনা করলে বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত হবে না।
ফিক্সেশন কী?
সরকারি চাকরিতে নতুন বেতন স্কেল কার্যকর হলে সাধারণত কর্মচারীদের বিদ্যমান বেতন নতুন স্কেলে নির্ধারণ করার একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, যাকে পে ফিক্সেশন বলা হয়।
এ প্রক্রিয়ায় কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন, চাকরির মেয়াদ, ইনক্রিমেন্ট এবং নতুন স্কেলের কাঠামো বিবেচনা করে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়।
অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতে, ফিক্সেশন একাধিকবার হয় না; সাধারণত নতুন স্কেল কার্যকর হওয়ার সময় একবারই করা হয়। পরবর্তীতে যদি ধাপে ধাপে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়, তবে তা আলাদা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে।
২০০৫ সালের উদাহরণ টানছেন কর্মচারীরা
বেতন কাঠামো নিয়ে চলমান আলোচনায় অনেকেই ২০০৫ সালের বেতন সংস্কারের উদাহরণ তুলে ধরছেন। তাদের দাবি, সে সময়ও বেতন বৃদ্ধির সুবিধা ধাপে ধাপে আর্থিকভাবে বাস্তবায়িত হলেও মূল বেতনের ফিক্সেশন একবারেই সম্পন্ন হয়েছিল।
তাদের মতে, এবারও যদি সরকার শতভাগ বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে ফিক্সেশন একবারেই সম্পন্ন হওয়া উচিত। পরবর্তীতে আর্থিক চাপ কমাতে বাড়তি সুবিধা কিস্তি বা ধাপে ধাপে দেওয়া যেতে পারে।
এক ধাপে বাস্তবায়নের দাবি
এদিকে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন এক ধাপে পূর্ণ মূল বেতন কার্যকরের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের আশঙ্কা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলে প্রকৃত সুবিধা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে এবং বেতন বৈষম্যও থেকে যেতে পারে।
এ দাবির সমর্থনে আগামী ১৯ জুন বিকেল ৩টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আকরাম খাঁ হলে এক মতবিনিময় সভা ও সমাবেশের আহ্বান জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
প্রশাসন ও বেতন কাঠামো বিশ্লেষকদের মতে, নবম পে-স্কেল নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, গেজেট প্রকাশ এবং ফিক্সেশন পদ্ধতি সম্পর্কে সরকারিভাবে কিছু ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট হিসাবকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়।
তাদের ভাষ্য, নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হবে—সরকার কীভাবে ফিক্সেশন নীতি নির্ধারণ করছে এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হলেও সেই সুবিধা কোন পদ্ধতিতে কর্মচারীদের কাছে পৌঁছাবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি গেজেট প্রকাশের পরই নবম পে-স্কেলের প্রকৃত কাঠামো, ফিক্সেশন পদ্ধতি এবং ধাপভিত্তিক বাস্তবায়নের বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ততদিন পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হিসাব-নিকাশকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

