সরকারি আপডেট নিউজ

নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির উচ্চপর্যায়ের বৈঠক: ২ ধাপে বাস্তবায়নের আলোচনা, নিম্ন গ্রেডে বেশি সুবিধার ইঙ্গিত

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে বুধবার (২৪ জুন ২০২৬) মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে সচিব কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত রূপরেখা, গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি, কারিগরি জটিলতা নিরসন এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

যদিও বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্রিফিং দেওয়া হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।

৩ ধাপ থেকে ২ ধাপে বাস্তবায়নের জোরালো আলোচনা

এর আগে নবম জাতীয় পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সেটিকে দুই ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়ে সচিব কমিটির বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দুই ধাপের প্রস্তাব অনুমোদন পেলে সরকারি চাকরিজীবীরা প্রথম ধাপেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূল বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বেতন বৈষম্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ কিছুটা লাঘব হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার

বৈঠকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীরা বেশি চাপের মধ্যে রয়েছেন—এ বিষয়টি আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে।

খসড়া আলোচনায় যে ফর্মুলা গুরুত্ব পেয়েছে, তাতে—

  • ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা প্রথম ধাপে প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধির প্রায় ৪০ শতাংশ সুবিধা পেতে পারেন।
  • ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী প্রথম ধাপেই প্রস্তাবিত বৃদ্ধির প্রায় ৬০ শতাংশ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

এই প্রস্তাব কার্যকর হলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি আর্থিক সুবিধা পাবেন, যা আয় বৈষম্য কমানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

iBAS++-এ হবে স্বয়ংক্রিয় বেতন ফিক্সেশন

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন পুনর্নির্ধারণ বা ফিক্সেশন সম্পন্ন করা।

এ কারণে সভায় সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার iBAS++-এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে বেতন ফিক্সেশনের একটি রোডম্যাপ উপস্থাপন করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী—

  • নতুন গেজেট প্রকাশের পর প্রয়োজনীয় তথ্য iBAS++-এ আপলোড করা হবে।
  • সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী হিসাব সম্পন্ন করবে।
  • ম্যানুয়াল ভুল কমবে এবং দ্রুত বেতন নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
  • সরকারি কোষাগার থেকে বেতন বিতরণ ব্যবস্থাও আরও সহজ হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ডিজিটাল ফিক্সেশন ব্যবস্থা চালু হলে অতীতের তুলনায় অনেক দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা যাবে।

১ জুলাই কার্যকর, তবে বাড়তি টাকা পেতে লাগতে পারে অক্টোবর পর্যন্ত

বৈঠকে আলোচিত তথ্য অনুযায়ী, সরকার আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর করার লক্ষ্য ধরে এগোচ্ছে।

তবে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং, প্রজ্ঞাপন জারি, সফটওয়্যার আপডেট এবং iBAS++-এ প্রয়োজনীয় ডেটা এন্ট্রির মতো কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে।

ফলে বাস্তবে বর্ধিত বেতনের টাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছাতে অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে আলোচনা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া অতিরিক্ত অর্থ পরবর্তীতে বকেয়া (এরিয়ার) হিসেবে একসঙ্গে পরিশোধ করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

ভাতা ও বিশেষ সুবিধা নিয়েও চূড়ান্ত পর্যালোচনা

মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা পুনর্নির্ধারণের বিষয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

বিশেষ করে—

  • চিকিৎসা ভাতা
  • বাড়ি ভাড়া ভাতা
  • যাতায়াত ভাতা
  • অন্যান্য আর্থিক সুবিধা

কী পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত পর্যালোচনা চলছে।

এছাড়া বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা (মহার্ঘ্য ভাতা) পাচ্ছেন, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সেটি কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, নতুন মূল বেতনের সঙ্গে এই সুবিধাগুলোর সমন্বয়ের একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।

এখনও হয়নি চূড়ান্ত ঘোষণা

তবে সচিব কমিটির বৈঠকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত নবম জাতীয় পে-স্কেলের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের তারিখ ঘোষণা করেনি। একই সঙ্গে কোনো গ্রেডভিত্তিক চূড়ান্ত বেতন তালিকাও প্রকাশ করা হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সচিব কমিটির আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

প্রত্যাশায় সরকারি চাকরিজীবীরা

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের প্রেক্ষাপটে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ এবং বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মহল সতর্ক অবস্থান বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। এখন সবার দৃষ্টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং নবম জাতীয় পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *