ব্যাংকিং নিউজ বাংলাদেশ

আয়কর রিটার্ন অডিটে পড়লে কী করবেন? নিরীক্ষা নিয়ে করদাতাদের ১০ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর

আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার পর অনেক করদাতার মধ্যেই একটি সাধারণ উদ্বেগ কাজ করে—‘আমার রিটার্ন কি অডিট বা নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হবে?’ অনেকের ধারণা, নিরীক্ষায় পড়া মানেই কর ফাঁকির অভিযোগ বা হয়রানির শিকার হওয়া। তবে বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে, আয়কর নিরীক্ষা কর প্রশাসনের একটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত যাচাই প্রক্রিয়া, যা কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে পরিচালিত হয়।

চলতি বছরে এনবিআর তিন দফায় মোট এক লাখ করদাতার আয়কর রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করেছে। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জমা দেওয়া রিটার্নগুলো থেকে এসব করদাতাকে বাছাই করা হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক বছর নিরীক্ষা কার্যক্রম সীমিত থাকার পর গত অর্থবছর থেকে আবারও নিয়মিত অডিট কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

নিরীক্ষা মানেই কর ফাঁকি নয়

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো করদাতার রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হওয়া মানেই তিনি কর ফাঁকি দিয়েছেন—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। নিরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো রিটার্নে দেওয়া আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় এবং কর পরিশোধসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।

অর্থাৎ, করদাতা সঠিক তথ্য দিয়েছেন কি না এবং কর নির্ধারণ যথাযথ হয়েছে কি না, তা যাচাই করাই এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য।

যাদের রিটার্ন অডিটে যেতে পারে

এনবিআরের স্বয়ংক্রিয় নির্বাচন পদ্ধতিতে যেকোনো করদাতার রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিরীক্ষার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি থাকে। যেমন—

  • আয় ও ব্যয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে।
  • অস্বাভাবিক বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন দেখা গেলে।
  • অতিরিক্ত কর রেয়াত বা কর অব্যাহতির দাবি করা হলে।
  • রিটার্নে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে অন্যান্য উৎসের তথ্যের অসঙ্গতি থাকলে।

অডিটের নোটিশ পেলে যা করবেন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরীক্ষার নোটিশ পাওয়ার পর আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমেই নোটিশটি মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। সেখানে কী তথ্য বা নথি চাওয়া হয়েছে, কত দিনের মধ্যে জমা দিতে হবে এবং কোথায় জমা দিতে হবে—এসব বিষয় বুঝে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে।

প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ কর আইনজীবী বা ট্যাক্স কনসালট্যান্টের পরামর্শ নেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ।

যেসব কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে

সাধারণত আয়কর নিরীক্ষার সময় করদাতার কাছ থেকে নিম্নলিখিত নথিপত্র চাওয়া হতে পারে—

  • আয়কর রিটার্ন ও কর হিসাব
  • বেতন বা আয়ের সনদ
  • ব্যাংক হিসাবের বিবরণী
  • উৎসে কর (টিডিএস) কর্তনের সনদ
  • ব্যবসায়িক হিসাবপত্র (যদি প্রযোজ্য হয়)
  • জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি বা অন্যান্য সম্পদের কাগজপত্র
  • বিনিয়োগসংক্রান্ত দলিল
  • ঋণ বা দায়ের প্রমাণপত্র

কর কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করা কি বাধ্যতামূলক?

সব ক্ষেত্রে নয়। অনেক সময় লিখিত ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিলেই নিরীক্ষার কার্যক্রম শেষ হয়। তবে প্রয়োজন হলে কর কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হতে পারে কিংবা শুনানিতে অংশ নিতে হতে পারে।

সময়মতো জবাব না দিলে কী হতে পারে?

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নোটিশের জবাব না দিলে কর কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারে। ফলে নোটিশ পাওয়ার পর সময়মতো উত্তর দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভুল তথ্য থাকলে কি সঙ্গে সঙ্গে জরিমানা হবে?

না। প্রতিটি ক্ষেত্রে করদাতাকে আগে নিজের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। ব্যাখ্যা ও দাখিল করা নথিপত্র সন্তোষজনক হলে অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে যায়। তাই নিরীক্ষা মানেই জরিমানা বা শাস্তি—এমন ধারণাও সঠিক নয়।

অতিরিক্ত কর নির্ধারণ হলে কী করবেন?

যদি নিরীক্ষার পর অতিরিক্ত কর নির্ধারণ করা হয়, তাহলে কর কর্তৃপক্ষ তার কারণ লিখিতভাবে জানাবে। এ অবস্থায় করদাতা চাইলে নির্ধারিত কর পরিশোধ করতে পারেন অথবা আইনে নির্ধারিত পদ্ধতিতে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন।

আপিলের সুযোগ রয়েছে

আয়কর আইনে নিরীক্ষার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আপিল দায়ের করে করদাতা তার বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন। ফলে কোনো সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও রয়েছে।

করদাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

কর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আয়কর নিরীক্ষাকে ভয়ের বিষয় হিসেবে নয়, বরং কর ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত। সঠিক তথ্য দিয়ে রিটার্ন দাখিল, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণ এবং কর কর্তৃপক্ষের নোটিশের যথাসময়ে জবাব দেওয়া হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরীক্ষা সহজেই সম্পন্ন হয়।

অতএব, করদাতা হিসেবে নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকলে আয়কর অডিট নিয়ে অযথা উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং স্বচ্ছ আর্থিক তথ্য ও আইন মেনে কর পরিশোধের অভ্যাসই একজন করদাতার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *