নতুন পে-স্কেলে পে-ফিক্সেশন: যেসব কাগজপত্র ও তথ্য আগে থেকেই প্রস্তুত রাখবেন
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণের (Pay Fixation) কার্যক্রম শুরু হয়েছে। iBAS++-এর Pay Fixation মডিউলের মাধ্যমে অনলাইনে তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি চাকরিজীবীদের পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণ, পদোন্নতি, বদলি, উচ্চতর গ্রেডসহ চাকরিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ নথি যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ৫ অক্টোবর থেকে পে-ফিকেশন শুরু এবং ২০ অক্টোবরের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা জানানো হয়েছে।
এদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে পে-ফিকেশনের সময় কোন কোন কাগজপত্র হাতে রাখতে হবে—এ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি চেকলিস্টে ১২ ধরনের তথ্য ও নথির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ছবিতে থাকা প্রতিটি কাগজ iBAS++-এর অনলাইন ইনপুটের জন্য বাধ্যতামূলক—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সরকারি নির্দেশনা ও সাম্প্রতিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে মূলত চাকরির তথ্য, পূর্ববর্তী ফিক্সেশন ও সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ সঠিকভাবে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ছবির চেকলিস্টে যে ১২টি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে
প্রচারিত তালিকা অনুযায়ী পে-ফিকেশনের আগে নিচের তথ্য ও কাগজপত্র প্রস্তুত রাখার কথা বলা হয়েছে—
১. বেতন গ্রহণের জন্য ব্যবহৃত এনআইডি নম্বর
যে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করে বর্তমানে বেতন গ্রহণ করছেন, সেটি হাতের কাছে রাখতে বলা হয়েছে। NID নম্বর পে-ফিকেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য।
২. নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর
iBAS++-এ নিবন্ধিত এবং পূর্বের বেতন বিলের সঙ্গে সংযুক্ত মোবাইল নম্বর সচল থাকা গুরুত্বপূর্ণ। OTP বা পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজনে এই নম্বর ব্যবহৃত হতে পারে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ ধরনের নিবন্ধিত সচল মোবাইল নম্বর প্রস্তুত রাখার কথা বলা হয়েছে।
৩. এসএসসি মূল সার্টিফিকেট
ছবির তালিকায় এসএসসি মূল সার্টিফিকেটের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এটি সবার অনলাইন পে-ফিকেশনের জন্য বাধ্যতামূলক সরকারি নথি—এমন নিশ্চিত তথ্য বর্তমান সরকারি/বিশ্বস্ত নির্দেশনায় পাওয়া যায়নি। তাই প্রয়োজন হলে দপ্তরীয় যাচাইয়ের জন্য প্রস্তুত রাখা যেতে পারে।
৪. নিয়োগ/পদোন্নতির কপি ও যোগদানের অফিস কপি
চাকরিতে নিয়োগের আদেশ, পদোন্নতির আদেশ এবং যোগদানের প্রমাণপত্র গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চাকরিতে যোগদানের তারিখ ও পদমর্যাদার তথ্য পে-ফিকেশনের হিসাবের সঙ্গে সম্পর্কিত।
৫. নিয়োগের সময়কার গ্রেড ও মূল বেতনের তথ্য
কোন গ্রেডে চাকরিতে যোগদান করেছেন এবং তখনকার মূল বেতন কত ছিল—এসব তথ্য আগের বেতন নির্ধারণের ধারাবাহিকতা যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
৬. স্ত্রী/সন্তানের এনআইডি বা জন্মনিবন্ধনের কপি
ছবির চেকলিস্টে স্ত্রী ও সন্তানের এনআইডি/জন্মনিবন্ধনের কপির কথাও রয়েছে। তবে এটিও মনে রাখা জরুরি—সাম্প্রতিক সরকারি পে-ফিকেশন সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এটিকে সাধারণ অনলাইন পে-ফিকেশনের আবশ্যিক ইনপুট হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। তাই সংশ্লিষ্ট দপ্তর চাইলে তবেই এটি জমা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
৭. টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড ও পদোন্নতির সব আদেশ
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাকরিজীবনে কখন টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড বা পদোন্নতি পেয়েছেন—সেসবের প্রজ্ঞাপন ও অফিস আদেশ সংরক্ষণ করা উচিত। এসব তথ্য নতুন মূল বেতন নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
৮. সার্ভিস বুকে তথ্য এন্ট্রি হয়েছে কি না
চাকরির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা—নিয়োগ, যোগদান, পদোন্নতি, বেতন নির্ধারণ, উচ্চতর গ্রেড, বদলি ইত্যাদি—সার্ভিস বুকে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
৯. পদোন্নতি বা বদলির পরের অফিস আদেশ
পদোন্নতির পর বদলি, সরকারি কাজে বদলি বা কর্মস্থল পরিবর্তন হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ ও এলপিসি (LPC) সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে। চাকরির ধারাবাহিকতা ও বেতন নির্ধারণের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এসব নথি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
১০. জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী পূর্বের পে-ফিকেশন কপি
আগের জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী যে বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার কপি হাতে রাখা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের তথ্য যাচাই করা হতে পারে।
১১. ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতনের কপি
এটি পে-ফিকেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর একটি। নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কর্মচারীর প্রকৃত মূল বেতন, বর্তমান গ্রেড ও বেতনধাপ বিবেচনায় আসবে।
১২. ১ জুলাই ২০২৬-এর বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কপি
যাদের ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ইনক্রিমেন্টের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বেতন নির্ধারণের সময় পূর্ববর্তী মূল বেতন ও প্রযোজ্য ইনক্রিমেন্টের তথ্যের সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।
শুধু কাগজ জমা দিলেই পে-ফিকেশন শেষ নয়
পে-ফিকেশনের বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা হলো—কাগজপত্র জমা দিলেই কাজ শেষ হয়ে যাবে।
বাস্তবে অনলাইনে iBAS++-এ প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাকরির রেকর্ডের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখতে পারে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইনে তথ্য দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বেতন ও হিসাব পরিশোধকারী কর্মকর্তার কার্যালয় চাকরির নথির সঙ্গে তথ্য যাচাই করবে।
অর্থাৎ একজন কর্মচারীর ক্ষেত্রে—
NID → জন্মতারিখ → যোগদানের তারিখ → বর্তমান পদ → গ্রেড → ৩০ জুনের মূল বেতন → পূর্বের পে-ফিকেশন → ইনক্রিমেন্ট → পদোন্নতি → বদলি → উচ্চতর গ্রেড/টাইম স্কেল → সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ
—এসব তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে পরবর্তী সময়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ভুল তথ্য দিলে কী হতে পারে?
পে-ফিকেশনের সময় ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিলে নতুন মূল বেতন নির্ধারণে সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন, গ্রেড, পূর্ববর্তী ফিক্সেশন, পদোন্নতি কিংবা উচ্চতর গ্রেডের তথ্য ভুল হলে পরবর্তী বেতন ও বকেয়া হিসাবেও প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো অনলাইনে তথ্য দেওয়ার আগে নিজের সার্ভিস বুক, সর্বশেষ বেতন বিল, পূর্ববর্তী পে-ফিকেশন এবং সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ মিলিয়ে দেখা।
অক্টোবরের বেতন ও বকেয়ার সঙ্গে সম্পর্ক
নতুন বেতন কাঠামোর পে-ফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে অক্টোবরের বেতন বিল প্রস্তুত হওয়ার কথা। একই সঙ্গে নতুন ও পুরোনো বেতনের পার্থক্যের ভিত্তিতে জুলাই থেকে পরবর্তী সময়ের বকেয়া বা এরিয়ার হিসাব হতে পারে। তবে সবার বকেয়ার পরিমাণ এক হবে না; গ্রেড, পুরোনো মূল বেতন, নতুন নির্ধারিত মূল বেতন এবং কার্যকর হওয়ার বিষয়সহ বিভিন্ন তথ্যের ওপর এটি নির্ভর করবে।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
ছবিতে প্রচারিত ১২ দফা তালিকাটি একটি প্রস্তুতিমূলক চেকলিস্ট হিসেবে দেখা ভালো। এর মধ্যে কিছু নথি দপ্তরীয় যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সবগুলোই যে iBAS++-এ অনলাইনে আপলোড করতে হবে বা প্রত্যেক কর্মচারীর জন্য বাধ্যতামূলক—এমন দাবি করা ঠিক হবে না।
সরকারি পে-ফিকেশন কার্যক্রমে নিশ্চিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে NID, জন্মতারিখ, বর্তমান পদ ও গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ, ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন এবং পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণ/পদোন্নতি/উচ্চতর গ্রেডসংক্রান্ত তথ্য ও নথি।
সুতরাং, পে-ফিকেশন করার আগে শুধু কাগজপত্র সংগ্রহ নয়—প্রতিটি তথ্য সার্ভিস বুক ও বেতন রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এতে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ এবং পরবর্তী বকেয়া হিসাবের সময় ভুলের ঝুঁকি কমবে।

