নবম পে-স্কেলের বকেয়া টাকা পেতে নতুন প্রক্রিয়া, গেজেটেড ও নন-গেজেটেড কর্মীদের জন্য পৃথক নির্দেশনা
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন পরিশোধের পাশাপাশি পূর্ববর্তী সময়ের বকেয়া বেতন বা অ্যারিয়ার (Arrears) উত্তোলন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। বকেয়া বেতন উত্তোলনের জন্য আপাতত অনলাইনভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় বিল দাখিলের পরিবর্তে ম্যানুয়াল পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে বলে প্রকাশিত একটি তথ্যচিত্রে জানানো হয়েছে। এতে গেজেটেড কর্মকর্তা এবং নন-গেজেটেড কর্মচারীদের জন্য পৃথকভাবে বিল প্রস্তুত ও দাখিলের পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, iBAS++ সিস্টেমে নতুন পে-স্কেলের বকেয়া বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রস্তুত কিংবা অনলাইনে জমা দেওয়ার সুযোগ না থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাগজে-কলমে বকেয়ার হিসাব তৈরি করতে হবে। এরপর নির্ধারিত ফরম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে বিল দাখিল করতে হবে।
বিশেষ করে গেজেটেড কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে TR Form 13 পূরণ করে টোকেনের মাধ্যমে বিল জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, নন-গেজেটেড কর্মচারীদের বকেয়া বিল সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ড্রয়িং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার (DDO) প্রস্তুত করে হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠাবেন।
বকেয়া বেতন উত্তোলনে কেন ম্যানুয়াল পদ্ধতি?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলে বেতন নির্ধারণের জন্য iBAS++ সফটওয়্যার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বেতন নির্ধারণ, বেতনসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ এবং নিয়মিত বেতন পরিশোধের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
তবে নতুন পে-স্কেলের বকেয়া বেতন উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রকাশিত তথ্যচিত্রে ম্যানুয়াল পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, নিয়মিত বেতন যেভাবে EFT-এর মাধ্যমে ব্যাংক হিসাবে জমা হচ্ছে, বকেয়া বেতনের ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয় অর্থ জমা হওয়ার সুযোগ আপাতত নেই বলে জানানো হয়েছে।
ফলে প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রাপ্য বকেয়া নির্ধারণ করে আলাদা হিসাব বিবরণী তৈরি করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও হিসাবরক্ষণ অফিসের মাধ্যমে বিল যাচাইয়ের পর অর্থ ছাড়ের কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
১ নভেম্বরের পর বকেয়া বিল দাখিলের সুযোগ
প্রকাশিত তথ্যচিত্রে বলা হয়েছে, ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে নতুন পে-স্কেলের প্রথম নিয়মিত বেতন অর্থাৎ অক্টোবর মাসের বেতন EFT-এর মাধ্যমে ব্যাংক হিসাবে সফলভাবে জমা হওয়ার পর থেকে ম্যানুয়াল বকেয়া বিল হিসাবরক্ষণ অফিসে দাখিল করা যাবে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিয়মিত বেতন জমা হওয়া এবং বকেয়া বিল দাখিলের প্রক্রিয়া এক নয়। প্রথমে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী নিয়মিত বেতন ব্যাংক হিসাবে জমা হতে হবে। এরপর বকেয়া হিসাব প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট অফিসে বিল দাখিলের কার্যক্রম শুরু করা যাবে বলে তথ্যচিত্রে উল্লেখ রয়েছে।
তবে বিল দাখিলের পরপরই বকেয়া অর্থ পাওয়া যাবে, এমনটি নিশ্চিত নয়। হিসাবরক্ষণ অফিসে বিল যাচাই, অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা হবে।
গেজেটেড কর্মকর্তাদের জন্য TR Form 13 পূরণ বাধ্যতামূলক
গেজেটেড সরকারি কর্মকর্তাদের বকেয়া বেতন উত্তোলনের ক্ষেত্রে TR Form 13 গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তথ্যচিত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের নিজ নিজ আইডি ব্যবহার করে নির্ধারিত TR Form 13 পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী কত টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে, তার বিস্তারিত হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করতে হবে।
এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ নির্ধারিত টোকেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে বিল জমা দিতে হবে।
গেজেটেড কর্মকর্তাদের করণীয়গুলো হলো:
1. নিজ নিজ আইডি থেকে TR Form 13 পূরণ করা।
2. নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বকেয়া বেতনের হিসাব প্রস্তুত করা।
3. প্রয়োজনীয় হিসাব বিবরণী ও কাগজপত্র সংযুক্ত করা।
4. নির্ধারিত নিয়মে টোকেন সংগ্রহ করা।
5. টোকেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে বিল দাখিল করা।
এ ক্ষেত্রে হিসাবের কোনো অসংগতি থাকলে বিল যাচাইয়ের সময় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বিল জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট হিসাব শাখার মাধ্যমে সব তথ্য মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
নন-গেজেটেড কর্মচারীদের বকেয়া বিল তৈরি করবেন DDO
গেজেটেড কর্মকর্তাদের তুলনায় নন-গেজেটেড কর্মচারীদের বকেয়া বিল দাখিলের পদ্ধতি কিছুটা আলাদা। তাঁদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ডিডিও (DDO) বিল প্রস্তুত ও দাখিলের দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রকাশিত তথ্যচিত্র অনুযায়ী, নন-গেজেটেড কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলের বকেয়া বেতন নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ডিডিও ম্যানুয়ালি বেতন বিল ও বকেয়া হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করবেন।
এরপর হিসাবরক্ষণ অফিসে যাচাইয়ের জন্য বিল পাঠাতে হবে। হিসাবরক্ষণ অফিস প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে বিল অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবে।
এ নিয়মের আওতায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অফিস সহায়ক, অফিস সহকারী, গাড়িচালক, কম্পিউটার অপারেটরসহ অন্যান্য নন-গেজেটেড কর্মচারীরা পড়তে পারেন।
তাই এসব পদে কর্মরত কর্মচারীদের নিজ নিজ দপ্তরের হিসাব শাখা এবং ডিডিওর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন। ব্যক্তিগতভাবে বিল প্রস্তুত করে জমা দেওয়ার পরিবর্তে দপ্তরের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
বকেয়া বেতনের হিসাব কীভাবে প্রস্তুত করতে হবে?
নতুন পে-স্কেলের বকেয়া বেতন নির্ধারণের সময় প্রত্যেক কর্মচারীর ব্যক্তিগত চাকরিসংক্রান্ত তথ্য এবং মাসভিত্তিক বেতন হিসাব বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশেষ করে নিচের বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন:
১. নতুন মূল বেতন: নতুন পে-স্কেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর নির্ধারিত মূল বেতন কত হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
২. পূর্ববর্তী মূল বেতন: পুরোনো পে-স্কেল অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মাসগুলোতে কত টাকা মূল বেতন উত্তোলন করা হয়েছে, তা হিসাব করতে হবে।
৩. মাসভিত্তিক বকেয়া: নতুন ও পুরোনো বেতনের পার্থক্য অনুযায়ী প্রতিটি মাসের প্রাপ্য বকেয়া নির্ধারণ করতে হবে।
৪. ভাতা সমন্বয়: বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, টিফিন ভাতা এবং অন্যান্য প্রযোজ্য ভাতার হিসাব সঠিকভাবে সমন্বয় করতে হবে।
৫. কর্তন ও সমন্বয়: সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রযোজ্য কর্তন এবং আগে উত্তোলিত অর্থ হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৬. চাকরিসংক্রান্ত তথ্য: পদবি, গ্রেড, যোগদানের তারিখ, পদোন্নতি, বদলি এবং বেতন নির্ধারণসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করতে হবে।
বকেয়া হিসাব প্রস্তুতের ক্ষেত্রে কোনো মাস বাদ পড়লে কিংবা ভুল বেতন উল্লেখ করা হলে বিলের মোট পরিমাণে অসংগতি তৈরি হতে পারে। তাই চূড়ান্ত বিল দাখিলের আগে মাসভিত্তিক হিসাব যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
নিয়মিত বেতন ও বকেয়া বিলের মধ্যে পার্থক্য
অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে, নতুন পে-স্কেলের নিয়মিত বেতন ব্যাংক হিসাবে জমা হলে বকেয়া টাকাও কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হবে?
প্রকাশিত তথ্যচিত্র অনুযায়ী, দুটি কার্যক্রম আলাদা।
নিয়মিত বেতন iBAS++-এর মাধ্যমে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় EFT করে ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়। অন্যদিকে, বকেয়া বেতনের জন্য আলাদা বিল ও হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করে হিসাবরক্ষণ অফিসে জমা দিতে হবে।
অর্থাৎ, নতুন পে-স্কেলে পে-ফিকেশন সম্পন্ন হওয়া মানেই বকেয়া বিল প্রস্তুত হয়ে যাওয়া নয়। বকেয়া অর্থ উত্তোলনের জন্য আলাদা প্রশাসনিক ও হিসাবসংক্রান্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
গেজেটেড ও নন-গেজেটেড কর্মচারীদের জন্য কোন নিয়ম প্রযোজ্য?
| বিষয় | গেজেটেড কর্মকর্তা | নন-গেজেটেড কর্মচারী |
|---|---|---|
| বিল প্রস্তুত | নিজ উদ্যোগে | সংশ্লিষ্ট DDO |
| বিলের ফরম | TR Form 13 | ম্যানুয়াল বেতন বিল |
| হিসাব বিবরণী | নিজে প্রস্তুত | দপ্তরের মাধ্যমে প্রস্তুত |
| বিল দাখিল | টোকেনের মাধ্যমে | DDO-এর মাধ্যমে |
| যাচাই | হিসাবরক্ষণ অফিস | হিসাবরক্ষণ অফিস |
বকেয়া বিল দাখিলের পর টাকা পেতে কত দিন লাগবে?
বকেয়া বিল দাখিলের পর কত দিনের মধ্যে টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা হবে, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যচিত্রে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।
সাধারণভাবে বিল প্রস্তুত, দাখিল, হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
এ কারণে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিল দ্রুত যাচাই ও অনুমোদন পেতে পারে, আবার কাগজপত্রে অসংগতি কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অন্য কারও ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগতে পারে।
সুতরাং বকেয়া বিল জমা দেওয়ার সুযোগ শুরু হওয়া এবং ব্যাংক হিসাবে বকেয়া অর্থ জমা হওয়ার সময়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
কর্মচারীদের এখন কী করণীয়?
নতুন পে-স্কেলের বকেয়া বেতন পাওয়ার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যাঁদের নতুন বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হয়েছে, তাঁদের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হিসাব শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করে বকেয়া হিসাব প্রস্তুতের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন।
নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ডিডিওর মাধ্যমে বিল প্রস্তুত করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, গেজেটেড কর্মকর্তাদের TR Form 13 ও প্রয়োজনীয় হিসাব বিবরণী প্রস্তুতের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
একই সঙ্গে বিল দাখিলের আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, বেতন নির্ধারণী বিবরণী এবং মাসভিত্তিক হিসাব সঠিক আছে কি না, তা যাচাই করা উচিত।
শেষ কথা
নতুন পে-স্কেলের বকেয়া বেতন উত্তোলনের ক্ষেত্রে আপাতত ম্যানুয়াল পদ্ধতি অনুসরণের তথ্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গেজেটেড ও নন-গেজেটেড কর্মচারীদের বিল প্রস্তুত এবং দাখিলের নিয়ম আলাদা হওয়ায় প্রত্যেককে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
প্রকাশিত তথ্যচিত্র অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলের প্রথম নিয়মিত বেতন EFT-এর মাধ্যমে ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পর বকেয়া বিল দাখিলের সুযোগ থাকবে। তবে বকেয়া বিল জমা দেওয়ার পর হিসাব যাচাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই অর্থ ছাড় করা সম্ভব হবে।

মন্তব্য (০)