পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপনে বিলম্ব, জুলাই থেকেই কার্যকর হলে বকেয়া বেতন কীভাবে পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা?
সরকার ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এখনো এ-সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আপাতত অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন। তবে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর ১ জুলাই থেকে প্রাপ্য অতিরিক্ত অর্থ একসঙ্গেই বকেয়া (এরিয়ার) হিসেবে পরিশোধ করা হবে।
জুলাই থেকে কার্যকর হলে কীভাবে মিলবে বকেয়া?
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার নির্ধারিত তারিখ যদি ১ জুলাইই বহাল থাকে, তাহলে প্রজ্ঞাপন প্রকাশে বিলম্ব হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক ক্ষতি হবে না। কারণ, নতুন বেতন কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে প্রজ্ঞাপন জারির আগ পর্যন্ত সময়ের বেতন পার্থক্য এককালীন এরিয়ার হিসেবে পরিশোধের প্রস্তুতি রয়েছে।
অর্থাৎ, প্রজ্ঞাপন আগস্ট, সেপ্টেম্বর বা পরবর্তী সময়ে প্রকাশ পেলেও জুলাই মাস থেকে যে অতিরিক্ত বেতন পাওয়ার কথা ছিল, তা পরবর্তী মাসের বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করে একসঙ্গে দেওয়া হবে।
কেন বিলম্ব হচ্ছে?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনি ধাপ এখনো বাকি রয়েছে। এসব ধাপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা সম্ভব নয়।
বাস্তবায়নের আগে যেসব ধাপ সম্পন্ন করতে হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- মন্ত্রিসভার অনুমোদন গ্রহণ।
- বিভিন্ন খাতের জন্য পৃথক সরকারি আদেশ প্রস্তুত।
- আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভেটিং।
- বিধিবদ্ধ আদেশ (এসআরও) নম্বর গ্রহণ।
- সরকারি মুদ্রণালয়ে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ।
- সংশ্লিষ্ট আর্থিক ও প্রশাসনিক সফটওয়্যার এবং হিসাব ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় হালনাগাদ।
এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই নতুন বেতন কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য
গত বুধবার সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ নিয়ে কাজ এখনো চলমান রয়েছে। কাজ শেষ হলে দ্রুত বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারির কার্যক্রম শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ঋণ কর্মসূচির কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই এবং প্রজ্ঞাপন জারিতে অযথা দীর্ঘসূত্রতা হবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন একটি দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়।
প্রক্রিয়ার প্রধান ধাপগুলো হলো—
- বেতন কমিশনের প্রতিবেদন দাখিল।
- সচিব কমিটি গঠন।
- সচিব কমিটির একাধিক বৈঠকে সুপারিশ পর্যালোচনা।
- সংশোধিত সুপারিশ প্রস্তুত।
- অর্থ বিভাগের চূড়ান্ত প্রস্তাব তৈরি।
- মন্ত্রিসভার অনুমোদন।
- আইনগত যাচাই ও এসআরও জারি।
- সরকারি গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশ।
- হিসাব ও বেতন ব্যবস্থায় বাস্তবায়ন।
এই প্রতিটি ধাপ শেষ হওয়ার পরই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন।
আইএমএফ কী বলছে?
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভর্তুকি, কৃষক কার্ড এবং ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।
আইএমএফের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতি এবং সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে নতুন পে-স্কেল চালু করলে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে সংস্থাটি নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে।
এ ছাড়া আগামী অক্টোবর মাসে আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পর এ বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি।
চাকরিজীবীদের জন্য কী বার্তা?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পুরোনো বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেলেও, নতুন প্রজ্ঞাপনে যদি ১ জুলাই ২০২৬ থেকেই কার্যকারিতা বহাল রাখা হয়, তাহলে ওই তারিখ থেকে প্রাপ্য অতিরিক্ত বেতন-ভাতা বকেয়া (এরিয়ার) হিসেবে পরিশোধ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে প্রজ্ঞাপন জারিতে বিলম্ব হলেও নির্ধারিত কার্যকর তারিখ থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
তবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের তারিখ, কার্যকারিতা এবং এরিয়ার পরিশোধের পদ্ধতি—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত সরকারি গেজেটে প্রকাশিত চূড়ান্ত আদেশের ওপর নির্ভর করবে।

