আইবাস++-এ উচ্চতর গ্রেডের বেতন নির্ধারণ: ধাপে ধাপে যা করতে হবে
সরকারি কর্মচারীদের উচ্চতর গ্রেডে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখন আইবাস++ (iBAS++)-ভিত্তিক ব্যবস্থার আওতায় আরও কাঠামোবদ্ধ হচ্ছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর বেতন নির্ধারণের তথ্য অনলাইনে দেওয়ার পাশাপাশি কর্মচারীর চাকরির ইতিহাস, পূর্ববর্তী বেতন, উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতার তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ সঠিকভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থ বিভাগের অনলাইন ব্যবস্থায় ‘উচ্চতর গ্রেড’ আলাদা বেতন নির্ধারণী অপশন হিসেবেও রয়েছে।
সাম্প্রতিক নির্দেশনা ও আইবাস++-এর কার্যপ্রণালি বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চতর গ্রেডের পে ফিক্সেশন কেবল একটি তথ্য এন্ট্রির বিষয় নয়; বরং তথ্য প্রদান, তারিখ নির্ধারণ, নথি সংযুক্তি, খসড়া রিপোর্ট যাচাই, ডিডিও পর্যায়ের যাচাই, হিসাবরক্ষণ অফিসের প্রতিপাদন এবং প্রয়োজন হলে সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো—সব মিলিয়ে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
উচ্চতর গ্রেডের পে ফিক্সেশনে প্রথম কাজ কী
কর্মচারীকে প্রথমে আইবাস++-এর নির্ধারিত বেতন নির্ধারণী ব্যবস্থায় প্রবেশ করে সংশ্লিষ্ট ‘উচ্চতর গ্রেড’ অপশন নির্বাচন করতে হবে। সরকারি আইবাস++ প্ল্যাটফর্মে চলমান বেতন নির্ধারণ, পদোন্নতি, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড ও ইনক্রিমেন্টসহ বিভিন্ন বেতন নির্ধারণের জন্য পৃথক অপশন রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—আইবাস++-এর নির্দেশনায় অপ্রয়োজনে কোনো অপশনে তথ্য এন্ট্রি না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ একটি বেতন নির্ধারণী সুবিধা ভুলভাবে আগে সম্পন্ন করলে পরবর্তী প্রয়োজনীয় বেতন নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
চাকরির তথ্য সঠিক থাকা জরুরি
উচ্চতর গ্রেডের বেতন নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর চাকরির রেকর্ডে থাকা তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—
- বর্তমান পদ ও গ্রেড;
- মূল বেতন;
- চাকরিতে যোগদানের তারিখ;
- পূর্ববর্তী ইনক্রিমেন্ট;
- পদোন্নতির তথ্য;
- আগে কোনো টাইমস্কেল বা সিলেকশন গ্রেড পাওয়া হয়েছে কি না;
- পূর্বে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া হয়েছে কি না;
- উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার প্রাপ্যতার তারিখ;
- সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ ও সার্ভিস রেকর্ড।
নতুন পে-স্কেলের বেতন নির্ধারণ সম্পর্কেও প্রকাশিত নির্দেশনায় পদ, গ্রেড, যোগদানের তারিখ, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে আইবাস++-এ হালনাগাদ রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কার্যকর তারিখ ভুল হলে সমস্যা হতে পারে
উচ্চতর গ্রেডের পে ফিক্সেশনে কার্যকর তারিখ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মচারী কোন তারিখ থেকে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হয়েছেন এবং অফিস আদেশে কোন তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে—সিস্টেমে তথ্য দেওয়ার সময় তা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কারণ বেতন নির্ধারণের সঙ্গে ইনক্রিমেন্ট, নতুন বেতন ধাপ এবং পরবর্তী আর্থিক সুবিধার হিসাবও যুক্ত হতে পারে। ফলে শুধু উচ্চতর গ্রেডের নতুন গ্রেড নির্বাচন করলেই হবে না; তার কার্যকর তারিখও সঠিক হতে হবে।
অফিস আদেশ আপলোড করতে হবে
উচ্চতর গ্রেডের দাবির প্রশাসনিক ভিত্তি হলো সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ। তাই নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অফিস আদেশের কপি আইবাস++-এ সংযুক্ত করতে হবে।
এ সময় খেয়াল রাখতে হবে—
১. অফিস আদেশটি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নামে কি না;
২. উচ্চতর গ্রেডের গ্রেড ও তারিখ সঠিক কি না;
৩. আদেশের সঙ্গে সিস্টেমে দেওয়া তথ্যের মিল রয়েছে কি না;
৪. আপলোড করা নথিটি স্পষ্ট ও পাঠযোগ্য কি না।
নথি ও অনলাইন তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে পরবর্তী যাচাই পর্যায়ে সেটি সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
খসড়া পে ফিক্সেশন রিপোর্টই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাচাইয়ের জায়গা
তথ্য পূরণ ও প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত করার পর সিস্টেমে যে খসড়া বেতন নির্ধারণী তথ্য পাওয়া যাবে, সেটি চূড়ান্তভাবে পাঠানোর আগে ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে দেখতে হবে—
পুরোনো মূল বেতন → প্রযোজ্য বেতন নির্ধারণ → উচ্চতর গ্রেডের নতুন ধাপ → কার্যকর তারিখ → ইনক্রিমেন্টের প্রভাব
—এই ধারাবাহিকতায় কোনো অসঙ্গতি আছে কি না।
নতুন পে-স্কেলের ক্ষেত্রেও আইবাস++-এ তথ্য জমা দেওয়ার আগে নির্ধারিত নতুন মূল বেতন সিস্টেমে দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
ডিডিওর কাছে যাবে আবেদন
কর্মচারী তথ্য পূরণ করে আবেদন সাবমিট করার পর সেটি সংশ্লিষ্ট ড্রইং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার (DDO)-এর কাছে যাবে।
ডিডিও পর্যায়ে চাকরির রেকর্ড এবং সিস্টেমে দেওয়া তথ্য যাচাই করা হবে। বিশেষ করে নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সার্ভিস বই অনুযায়ী আগের চাকরি, বেতন এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না—তা যাচাইয়ের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
গেজেটেড কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ডিডিও যাচাই শেষে বেতন নির্ধারণী বিবরণী সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠানোর প্রক্রিয়া রয়েছে।
হিসাবরক্ষণ অফিসে হবে পরবর্তী যাচাই
ডিডিও পর্যায়ের পর আবেদন যাবে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে। সেখানে অনলাইনে তথ্য যাচাই করে বেতন নির্ধারণের বিবরণী অনুমোদন ও প্রতিপাদন করা হবে।
এই পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে কর্মচারীর অনলাইন তথ্য, চাকরির রেকর্ড এবং বেতন নির্ধারণের ভিত্তি পর্যালোচনা করা হয়।
সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী অনুমোদনের পর আইবাস++ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরি করবে। এরপর সেই নম্বর ও নির্ধারিত বেতন সার্ভিস বইয়ে লিপিবদ্ধ করতে হবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেখানে স্বাক্ষর করবেন।
ভুল হলে ‘সেন্ডব্যাক’—তারপর পুনরায় যাচাই
উচ্চতর গ্রেডের পে ফিকেশনে কোনো তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ পাওয়া গেলে সেটি সরাসরি অনুমোদনের বদলে সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে ফেরত পাঠানো হতে পারে।
এই সেন্ডব্যাক ব্যবস্থার গুরুত্ব হলো—ভুল বেতন নির্ধারণ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সংশোধনের সুযোগ পাওয়া।
যেমন—
- ভুল কার্যকর তারিখ;
- ভুল বেতন;
- ভুল গ্রেড;
- ইনক্রিমেন্টের তথ্যের অসঙ্গতি;
- উচ্চতর গ্রেডের অফিস আদেশে ভুল তথ্য;
- চাকরির পূর্ববর্তী রেকর্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্য
পাওয়া গেলে সংশোধন করে আবার খসড়া পে ফিকেশন তৈরি করে যাচাইয়ের জন্য পাঠাতে হতে পারে।
একই সময়ে একাধিক বেতন নির্ধারণের বিষয় থাকলে সতর্কতা
১ জুলাই ২০২৬-কে কেন্দ্র করে অনেক কর্মচারীর ক্ষেত্রে নতুন পে-স্কেল, ইনক্রিমেন্ট এবং উচ্চতর গ্রেড—একাধিক বেতন নির্ধারণী বিষয় একই সময়ের কাছাকাছি এসে পড়েছে। এ কারণে কোন সুবিধাটি আগে প্রাপ্য এবং কোন fixation আগে করতে হবে—এটি ব্যক্তিভেদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইবাস++-এর সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, একাধিক বিষয়ে ফরম পূরণের প্রয়োজন হলে যেটি আগে প্রাপ্য সেটি আগে নির্বাচন ও সম্পন্ন করতে হবে। অপ্রয়োজনে কোনো অপশনে এন্ট্রি করলে পরবর্তী অপশনে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অতএব, শুধু “আগে উচ্চতর গ্রেড” বা “আগে ইনক্রিমেন্ট”—এমন একটি সাধারণ সূত্র সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ না করে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর চাকরির ইতিহাস, প্রাপ্যতার তারিখ এবং প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী fixation করতে হবে।
১ জুলাই ২০২৬-এর ক্ষেত্রে কেন বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ গত ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে এবং ১৭ সেপ্টেম্বর ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন কাঠামোর বেতন নির্ধারণ অনলাইনে আইবাস++-এর মাধ্যমে করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ফলে যেসব কর্মচারীর উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা ১ জুলাই ২০২৬-এর সঙ্গে সম্পর্কিত, তাদের ক্ষেত্রে পুরোনো বেতন, নতুন পে-স্কেলের fixation এবং উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা—তিনটি বিষয় সমন্বয় করে দেখতে হবে।
কর্মচারীদের জন্য চেকলিস্ট
উচ্চতর গ্রেডের পে ফিকেশন করার আগে নিচের বিষয়গুলো মিলিয়ে নেওয়া নিরাপদ—
১. ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন কত ছিল।
২. ৩০ জুনের গ্রেড ও বেতন ধাপ সঠিক কি না।
৩. উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তারিখ কী।
৪. উচ্চতর গ্রেডের অফিস আদেশ আছে কি না।
৫. আগে কোনো টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড/উচ্চতর গ্রেড পাওয়া হয়েছে কি না।
৬. ১ জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্ট প্রাপ্য কি না।
৭. চাকরির রেকর্ড ও সার্ভিস বইয়ের তথ্য আইবাস++-এর সঙ্গে মিলে কি না।
৮. খসড়া পে ফিকেশনে নতুন বেতন সঠিকভাবে এসেছে কি না।
৯. ডিডিও পর্যায়ে যাচাইয়ের পর কোনো সংশোধনী এসেছে কি না।
১০. হিসাবরক্ষণ অফিসের অনুমোদনের পর ভেরিফিকেশন নম্বর সংরক্ষণ ও সার্ভিস বইয়ে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে কি না।
পুরো প্রক্রিয়াটি এক নজরে
উচ্চতর গ্রেডের অফিস আদেশ
↓
আইবাস++-এ ‘উচ্চতর গ্রেড’ নির্বাচন
↓
চাকরি ও পূর্ববর্তী বেতনের তথ্য প্রদান
↓
কার্যকর তারিখ নির্বাচন
↓
অফিস আদেশ আপলোড
↓
খসড়া পে ফিকেশন তৈরি
↓
তথ্য যাচাই
↓
ডিডিও পর্যায়ে যাচাই
↓
হিসাবরক্ষণ অফিসে প্রেরণ
↓
প্রয়োজনে সেন্ডব্যাক ও সংশোধন
↓
পুনরায় যাচাই
↓
অনুমোদন ও ভেরিফিকেশন নম্বর
↓
সার্ভিস বইয়ে বেতন ও ভেরিফিকেশন নম্বর লিপিবদ্ধ
শেষ কথা
আইবাস++-এ উচ্চতর গ্রেডের বেতন নির্ধারণ এখন কাগজপত্রের পাশাপাশি একটি সমন্বিত ডিজিটাল যাচাই প্রক্রিয়া। ফলে কর্মচারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক তথ্য দেওয়া এবং সাবমিট করার আগে খসড়া ফলাফল ভালোভাবে যাচাই করা।
বিশেষ করে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর একই সময়ে উচ্চতর গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট বা অন্য কোনো বেতন নির্ধারণী সুবিধা প্রাপ্য হলে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হবে। সরকারি আইবাস++ নির্দেশনা অনুযায়ী একাধিক fixation-এর ক্ষেত্রে আগে প্রাপ্য বিষয়টি আগে সম্পন্ন করার নীতি অনুসরণ করতে হবে।
সুতরাং উচ্চতর গ্রেডের পে ফিকেশনে শুধু নতুন বেতন কত হবে সেটিই নয়, কোন তারিখ থেকে প্রাপ্য, পূর্ববর্তী বেতন কত ছিল, আগে কী কী সুবিধা পাওয়া হয়েছে, কোন নথির ভিত্তিতে উচ্চতর গ্রেড দেওয়া হয়েছে এবং সিস্টেমে কোন ক্রমে fixation করতে হবে—এসব বিষয়ই চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

