৮ম জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫: সরকারি কর্মচারীদের জন্য যুগান্তকারী পরিবর্তনে বৈষম্য? - Technical Alamin
সরকারি আদেশ ও তথ্য

৮ম জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫: সরকারি কর্মচারীদের জন্য যুগান্তকারী পরিবর্তনে বৈষম্য?

সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫’ জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই আদেশটি ১ জুলাই ২০১৫ তারিখ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে এই নতুন কাঠামোতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল থাকলেও বেতন ও ভাতাদিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে

বেতন কাঠামোর মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতন: নতুন স্কেল অনুযায়ী সর্বোচ্চ বেতন (১ম গ্রেড) ৭৮,০০০ টাকা (নির্ধারিত) এবং সর্বনিম্ন বেতন (২০তম গ্রেড) ৮,২৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে

  • বিশেষ পদমর্যাদা: মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের বেতন ৮৬,০০০ টাকা এবং সিনিয়র সচিবদের বেতন ৮২,০০০ টাকা (নির্ধারিত) করা হয়েছে

  • টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বিলোপ: নতুন আদেশে সিলেকশন গ্রেড এবং টাইম স্কেল বা উচ্চতর স্কেল প্রদানের বিদ্যমান ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়েছে এর পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময় অন্তর স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির বিধান রাখা হয়েছে

  • গ্রেডভিত্তিক পরিচিতি: এখন থেকে সরকারি কর্মচারীদের ১ম, ২য়, ৩য় ও ৪্থ শ্রেণির পরিবর্তে কেবল বেতনস্কেলের গ্রেড দ্বারা পরিচিত করা হবে

ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি:

  • নববর্ষ ভাতা: সরকারি চাকরিতে প্রথমবারের মতো মূল বেতনের ২০% হারে ‘বাংলা নববর্ষ ভাতা’ প্রবর্তন করা হয়েছে, যা ১৪২৩ বঙ্গাব্দ থেকে কার্যকর হবে

  • চিকিৎসা ভাতা: সকল কর্মরত কর্মচারীর জন্য মাসিক ১,৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে তবে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের অবসরভোগীদের জন্য এই হার ২,৫০০ টাকা

  • বাড়ি ভাড়া: ১ জুলাই ২০১৬ থেকে এলাকাভেদে মূল বেতনের ৩৫% থেকে ৬৫% পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া প্রদানের নতুন হার কার্যকর হবে

  • মহার্ঘ ভাতা বিলোপ: নতুন স্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে আগের মহার্ঘ ভাতা বিলুপ্ত করা হয়েছে

পেনশন ও গ্র্যাচুইটি: অবসরপ্রাপ্তদের জন্য সর্বনিম্ন মাসিক নীট পেনশনের পরিমাণ ৩,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এছাড়া ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের পেনশনভোগীদের নীট পেনশন ৫০% এবং অন্যদের জন্য ৪০% বৃদ্ধি করা হয়েছে কর্মচারীরা ১৮ মাসের ছুটি নগদায়নের সুবিধাও পাবেন

বেতন নির্ধারণ ও ইনক্রিমেন্ট: সকল সরকারি কর্মচারীর জন্য এখন থেকে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির (Increment) তারিখ হবে প্রতি বছর ১ জুলাই যারা ১ জুলাই ২০১৫-এর আগে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের বেতন নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপে বা পরবর্তী উচ্চতর ধাপে নির্ধারিত হবে

এই নতুন বেতন কাঠামোর ফলে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কয়েক লক্ষ কর্মচারী আর্থিকভাবে লাভবান হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে জুডিশিয়াল সার্ভিস এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মচারীদের জন্য এটি প্রযোজ্য হবে না, কারণ তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে

National Pay Scale 2015

এটি কি কর্মচারী বান্ধব বেতন কাঠামো ছিল?

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ ‘কর্মচারী বান্ধব’ ছিল কি না, তা নিয়ে মিশ্র বিশ্লেষণ রয়েছে। তবে অধিকাংশের মতে, এটি পূর্ববর্তী স্কেলগুলোর তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক এবং সুবিধাজনক ছিল। নিচে এর যৌক্তিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:

১. বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি

২০১৫ সালের বেতন কাঠামোতে আগের তুলনায় মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছিল।

  • সর্বনিম্ন বেতন: ৪,১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮,২৫০ টাকা করা হয়।

  • সর্বোচ্চ বেতন: ৪০,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৮,০০০ টাকা (নির্ধারিত) করা হয়। এই বিশাল ব্যবধানে বেতন বৃদ্ধি সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

২. বাংলা নববর্ষ ভাতা প্রবর্তন

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই বেতন স্কেলের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ‘বাংলা নববর্ষ ভাতা’ (মূল বেতনের ২০%) চালু করা হয়। এটি কর্মচারীদের উৎসবের আনন্দ বৃদ্ধিতে এবং সংস্কৃতিচর্চায় উৎসাহিত করেছে।

৩. স্বয়ংক্রিয় বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (Increment)

আগে ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট তারিখ বা বছর পূর্ণ হওয়ার জটিলতা ছিল। ২০১৫ সালের স্কেলে প্রতি বছর ১ জুলাই তারিখে সকল কর্মচারীর জন্য একসাথে ইনক্রিমেন্ট কার্যকর করার নিয়ম করা হয়, যা অত্যন্ত সহজবোধ্য ও কর্মচারী বান্ধব।

৪. শ্রেণি প্রথা বিলোপ

আগে সরকারি কর্মচারীদের ১ম, ২য়, ৩য় ও ৪্থ শ্রেণি হিসেবে ভাগ করা হতো, যা অনেক সময় মর্যাদাহানিকর মনে করা হতো। ২০১৫ সালের আদেশে এই শ্রেণি প্রথা বিলুপ্ত করে কেবল গ্রেড (১-২০) প্রথা চালু করা হয়, যা সামাজিক মর্যাদা ও সাম্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।

৫. পেনশন ও গ্র্যাচুইটি সুবিধা

পেনশনভোগীদের জন্য মাসিক নূন্যতম পেনশন ৩,০০০ টাকা নির্ধারণ করা এবং পেনশনের হার বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়া গ্র্যাচুইটির হার বৃদ্ধি এবং ল্যাম্প গ্র্যান্ট (ছুটি নগদায়ন) ১৮ মাস পর্যন্ত করায় অবসরপ্রাপ্তদের জন্য এটি অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক ছিল।

কিছু সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক:

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও ছিল, যা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে:

  • টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বিলোপ: এই স্কেলে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ‘টাইম স্কেল’ ও ‘সিলেকশন গ্রেড’ তুলে দেওয়া হয়েছিল। অনেক কর্মচারীর মতে, এর ফলে পদোন্নতি না পাওয়া কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুযোগ কমে গেছে।

  • মুদ্রাস্ফীতি: বেতন বাড়ার সাথে সাথে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ও বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা খুব একটা সুফল পাননি বলে দাবি করেন।

উপসংহার: সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোটি সরকারি কর্মচারীদের জন্য ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শ্রেণি বৈষম্য দূর করা, নববর্ষ ভাতা চালু করা এবং বেতন দ্বিগুণ করার কারণে এটি অধিকাংশ কর্মচারীর কাছে ‘বান্ধব’ হিসেবেই বিবেচিত হয়, যদিও টাইম স্কেল বিলোপের বিষয়টি কিছুটা অসন্তোষ তৈরি করেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *