রেশন ব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকার—কেন এই বৈষম্য?
বাংলাদেশের সরকারি ব্যবস্থায় ‘রেশন’ শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে নির্দিষ্ট কিছু বাহিনীর ছবি। চাল, ডাল, তেল আর চিনির এই সুবিধা কেন শুধু নির্দিষ্ট কিছু সংস্থার জন্য সীমাবদ্ধ, আর কেনই বা এটি সাধারণ নাগরিক বা সকল সিভিল সার্ভিসের জন্য উন্মুক্ত নয়—তা নিয়ে জনমনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কৌতূহল।
১. নির্দিষ্ট সংস্থায় রেশন ব্যবস্থার যৌক্তিক ভিত্তি
সামরিক বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি বা কোস্ট গার্ডের মতো শৃঙ্খলা বাহিনীকে রেশন দেওয়ার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে:
-
চাকরির ধরন ও ঝুঁকি: এই বাহিনীর সদস্যদের ২৪ ঘণ্টা ডিউটিতে থাকতে হয়। অনেক সময় দুর্গম এলাকায় বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয় যেখানে বাজার সুবিধা নেই। তাদের পুষ্টি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নিরাপত্তারই অংশ।
-
বেতনের কাঠামো ও ভর্তুকি: ঐতিহাসিকভাবে এই বাহিনীর সদস্যদের বেতন কাঠামো এমনভাবে বিন্যাস করা হয়েছিল যেখানে রেশনের একটি বড় ভূমিকা ছিল। অর্থাৎ, নগদ টাকার বদলে খাদ্যের যোগান দিয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান স্থিতিশীল রাখা হয়।
-
পারিবারিক নিরাপত্তা: মাঠ পর্যায়ে বা ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে থাকা অবস্থায় যেন পরিবারের খাদ্য নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতেই এই বিশেষ ব্যবস্থা।
২. সিভিল সার্ভিসে রেশন নেই কেন?
বিসিএস ক্যাডার বা অন্যান্য সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে রেশন না থাকার পেছনে সরকারের যুক্তি হলো—তাদের জন্য ‘পে-স্কেল’ বা বেতন কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে বাজার দর অনুযায়ী তারা কেনাকাটা করতে পারেন। সরকার মনে করে, রেশন দেওয়ার চেয়ে সরাসরি বেতন বাড়ানো প্রশাসনিকভাবে সহজ। এছাড়া বিশাল সংখ্যক সিভিল সার্ভিসকে রেশন দেওয়া মানে বিশাল বড় একটি লজিস্টিক চেইন মেইনটেইন করা, যা রাষ্ট্রের জন্য অনেক সময় ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে দাঁড়ায়।
৩. সকল নাগরিকের জন্য রেশন: সমাধান নাকি নতুন সংকট?
আপনি সঠিক ধরেছেন যে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের শক্ত পদক্ষেপ অনেক সময় বিফলে যায়। তবে সকল নাগরিককে রেশন কার্ডের আওতায় আনা সরকারের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। কেন এটি সরাসরি কার্যকর হচ্ছে না?
-
বিশাল ভর্তুকির চাপ: বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষকে রেশন দিতে গেলে বাজেটের সিংহভাগ চলে যাবে ভর্তুকিতে। এতে শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো উন্নয়নমূলক খাতে অর্থায়ন কমে যেতে পারে।
-
সিস্টেম লস ও দুর্নীতি: অতীতে আমাদের দেশে ‘রেশন কার্ড’ ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু সেখানে ব্যাপক অনিয়ম ও কালোবাজারির অভিযোগ ছিল। প্রকৃত অভাবীরা অনেক সময় কার্ড পেত না।
-
মুক্তবাজার অর্থনীতি: বাংলাদেশ বর্তমানে মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করে। সরকার সরাসরি পণ্য বিতরণের চেয়ে ওএমএস (OMS) বা টিসিবি (TCB)-এর মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, যা মূলত এক ধরণের ‘সীমিত রেশন ব্যবস্থা’।
৪. বিকল্প সমাধান কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢালাও রেশন না দিয়ে সরকার নিচের পদ্ধতিগুলো নিয়ে কাজ করছে:
-
স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড: ইতোমধ্যে ১ কোটি পরিবারকে টিসিবির কার্ড দেওয়া হয়েছে। এটি রেশনেরই একটি আধুনিক রূপ।
-
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা বা ভিজিডি-এর মাধ্যমে অতি দরিদ্রদের সুরক্ষা দেওয়া।
-
বাজার তদারকি ও সরবরাহ নিশ্চিত: সিন্ডিকেট ভাঙতে রেশনের চেয়েও কার্যকর উপায় হলো সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কিনে বাফারে স্টক রাখা।
পরিশেষে: রেশন ব্যবস্থা মূলত একটি সুরক্ষা কবচ। যুগ যুগ ধরে এটি চলে আসছে কারণ শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এটি তাদের ‘অঘোষিত বেতন’। তবে ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জন্য “সার্বজনীন রেশন ব্যবস্থা” প্রবর্তন করা যায় কি না—তা নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলে ভাবনার অবকাশ রয়েছে।
সরকার কেন রেশন প্রদান করে?
সরকার মূলত সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং নির্দিষ্ট কিছু পেশাজীবীর কাজের বিশেষ ধরন বিবেচনায় রেখে রেশন প্রদান করে। এর পেছনে প্রধানত তিনটি কৌশলগত ও মানবিক কারণ কাজ করে:
১. বাহিনীর কর্মদক্ষতা ও মনোবল রক্ষা
সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি এবং অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দেশের স্বার্থে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে (যেমন—যুদ্ধ, দুর্যোগ বা দুর্গম সীমান্তে) ডিউটি করতে হয়।
-
পুষ্টি নিশ্চিতকরণ: তাদের শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্যালরি বা পুষ্টির প্রয়োজন হয়, যা রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্র নিশ্চিত করে।
-
মানসিক প্রশান্তি: একজন সদস্য যখন দুর্গম পাহাড়ে বা সীমান্তে থাকেন, তখন তার পরিবারের খাদ্য নিয়ে যেন দুশ্চিন্তা করতে না হয়, সেই নিশ্চয়তা তাকে একাগ্রভাবে দায়িত্ব পালনে সাহায্য করে।
২. বাজারমূল্যের অস্থিরতা থেকে সুরক্ষা
সাধারণ মানুষের জন্য সরকার যখন রেশন বা টিসিবি (TCB)-এর মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য দেয়, তার মূল লক্ষ্য থাকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা।
-
ভর্তুকি: সরকার বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে পণ্য কিনে তা সাধারণের মাঝে বিতরণ করে। এটি মূলত নিম্নবিত্ত মানুষের প্রকৃত আয় (Real Income) বাড়াতে সাহায্য করে।
-
মূল্য স্থিতিশীল রাখা: খোলা বাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে সরকার ওএমএস (OMS) বা ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে চাল, ডাল, তেল সরবরাহ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট দূর করার চেষ্টা করে।
৩. ঐতিহাসিক ও বেতন কাঠামোর অংশ
অনেক সরকারি সংস্থায় রেশন সুবিধা তাদের মূল সুযোগ-সুবিধার একটি অংশ হিসেবে স্বীকৃত।
-
বেতনের বিকল্প সুবিধা: অনেক সময় সরাসরি বেতন না বাড়িয়ে সরকার নিত্যপণ্য কম দামে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমায়, কারণ সরাসরি নগদ টাকা দেওয়ার চেয়ে পণ্য সরবরাহ করা অনেক ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হয়।
কেন এটি সবার জন্য নয়?
সবাইকে রেশন দিতে না পারার প্রধান কারণ হলো বিশাল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক সক্ষমতা। ১৭ কোটি মানুষকে রেশন দিতে গেলে যে পরিমাণ গুদামজাতকরণ, পরিবহন এবং তদারকির প্রয়োজন, তা বর্তমান কাঠামোতে অত্যন্ত জটিল। তাই সরকার এখন ‘টার্গেটেড’ বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর (যেমন—কার্ডধারী ১ কোটি পরিবার) জন্য এই সুবিধা সীমিত রেখেছে।

