এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ৯ দফা দাবি ২০২৬ । শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের ডাক দিচ্ছে শিক্ষক সংগঠন?
দেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারী তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বৈষম্য নিরসনে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর বিভিন্ন আশাব্যঞ্জক বক্তব্যের পর শিক্ষকরা এখন ‘চমক’ হিসেবে এই দাবিগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে চান। তাদের মূল লক্ষ্য— সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয় সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করা।
শিক্ষকদের উত্থাপিত ৯ দফা দাবি:
শিক্ষক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে যে দাবিগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে: ১. শতভাগ উৎসব ভাতা: বর্তমানে শিক্ষকরা মূল বেতনের মাত্র ২৫% উৎসব ভাতা পান, যা শতভাগে উন্নীত করার দাবি জানানো হয়েছে।
২. সরকারি নিয়মে মেডিকেল ভাতা: সরকারি কর্মচারীদের ন্যায় চিকিৎসা ভাতা নিশ্চিত করা।
৩. ১০% কর্তন বন্ধ: অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের নামে বেতন থেকে অতিরিক্ত ১০% কর্তন বন্ধের দাবি।
৪. পেনশন ব্যবস্থা: অবসরের পর শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক পেনশন সুবিধা চালু করা।
৫. দ্রুত পাওনা পরিশোধ: অবসর গ্রহণের ৬ মাসের মধ্যে অবসর ও কল্যাণের অর্থ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
৬. অটোমেশন এমপিওভুক্তি: এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা।
৭. নীতিমালা সংস্কার: বৈষম্যমূলক কালাকানুন বাতিল করে সকল অধিদপ্তরের জন্য এক ও অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন।
৮. সর্বজনীন বদলি: এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য ঐচ্ছিক বদলি ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন।
৯. শ্রান্তি বিনোদন ভাতা: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষকদের শ্রান্তি বিনোদন ভাতার আওতাভুক্ত করা।
জাতীয়করণের পক্ষে যুক্তি
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল আয় (ছাত্র বেতন, সেশন ফি ও অন্যান্য) সরকারি তহবিলে জমা নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করলে সরকারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ পড়বে না। বরং এর ফলে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে এবং শিক্ষকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
সরকারের অবস্থান
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষকদের উৎসব ভাতা বৃদ্ধি এবং বদলি নীতিমালা নিয়ে কাজ চলছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিভিন্ন সভায় শিক্ষকদের রাজপথ ছেড়ে শ্রেণিকক্ষে ফেরার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সরকার শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিগুলো ধাপে ধাপে পূরণের চেষ্টা করছে। তবে জাতীয়করণের মতো বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সারসংক্ষেপ: শিক্ষকরা মনে করছেন, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্মার্ট শিক্ষক সমাজ প্রয়োজন। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে এই ৯ দফা দাবি বাস্তবায়ন ও শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি।

জাতীয়করণ করলে শিক্ষকগণ কি সুবিধা অতিরিক্ত পাবেন?
শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ (Nationalization) করা হলে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের মতো সমমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন। বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরকারি স্কেলে মূল বেতন পেলেও অনেক মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
জাতীয়করণ হলে শিক্ষকরা অতিরিক্ত যে সুবিধাগুলো পাবেন, তা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা (Bonus)
বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মূল বেতনের মাত্র ২৫% (শিক্ষক) এবং ৫০% (কর্মচারী) উৎসব ভাতা পান। জাতীয়করণ হলে তারা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১০০% বা পূর্ণাঙ্গ মূল বেতনের সমান ঈদ বা পূজার বোনাস পাবেন।
২. বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা
-
বাড়ি ভাড়া: বর্তমানে শিক্ষকরা মাত্র ১,০০০ টাকা নির্দিষ্ট বাড়ি ভাড়া পান। জাতীয়করণ হলে তারা মূল বেতনের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত) সরকারি হারে বাড়ি ভাড়া পাবেন।
-
চিকিৎসা ভাতা: বর্তমানে শিক্ষকরা মাত্র ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। সরকারি হলে এটি ১,৫০০ টাকা বা তার বেশি (সরকারি নিয়ম অনুযায়ী) হবে।
৩. পেনশন ও গ্র্যাচুইটি সুবিধা
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য বর্তমানে কোনো কার্যকর পেনশন ব্যবস্থা নেই। তারা শুধু অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের এককালীন কিছু টাকা পান, যা পেতে অনেক সময় বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। জাতীয়করণ হলে অবসরের পর আজীবন পেনশন এবং বড় অংকের গ্র্যাচুইটি সুবিধা নিশ্চিত হবে।
৪. ১০% বেতন কর্তন বন্ধ
বর্তমানে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য শিক্ষকদের মূল বেতন থেকে ১০% টাকা কেটে রাখা হয়। জাতীয়করণ হলে এই টাকা আর কাটা হবে না, বরং সরকারই পেনশনের দায়িত্ব নেবে। ফলে শিক্ষকদের হাতে আসা নিট বেতনের পরিমাণ বাড়বে।
৫. বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও উচ্চতর গ্রেড
সরকারি শিক্ষকদের মতো নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর উচ্চতর গ্রেড বা টাইম স্কেল প্রাপ্তি অনেক বেশি সহজ ও নিয়মমাফিক হবে। পদোন্নতির ক্ষেত্রেও সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করা হবে।
৬. শ্রান্তি বিনোদন ভাতা ও বদলি সুবিধা
-
শ্রান্তি বিনোদন: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৩ বছর অন্তর ১৫ দিনের অর্জিত ছুটিসহ এক মাসের মূল বেতনের সমান ভাতা পাবেন।
-
বদলি: বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল বা নেই বললেই চলে। জাতীয়করণ হলে সরকারি শিক্ষকদের মতো এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলি হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
৭. সন্তানদের শিক্ষা ও অন্যান্য সুবিধা
সরকারি কর্মচারী হিসেবে শিক্ষকরা সন্তানদের জন্য শিক্ষা ভাতা, লোন সুবিধা (যেমন: গৃহ নির্মাণ ঋণ) এবং সরকারি হাসপাতালের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন।
সারসংক্ষেপ: জাতীয়করণ হলে মূলত শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এটি শিক্ষকতাকে একটি আকর্ষণীয় পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আরও আগ্রহী হবে।

