সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য নতুন দিগন্ত: জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫ এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫’ জারি করেছে । এই আদেশটি ১ জুলাই ২০১৫ থেকে কার্যকর করা হয়েছে । নতুন এই বেতনস্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেডের বেতন কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং পূর্বের সকল মহার্ঘ ভাতা বিলুপ্ত করা হয়েছে ।
বেতন কাঠামোর প্রধান পরিবর্তনসমূহ
জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫ অনুযায়ী সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারিত হয়েছে ৮,২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন (নির্ধারিত) ৭৮,০০০ টাকা । তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের বেতন ৮৬,০০০ টাকা (নির্ধারিত) এবং সিনিয়র সচিবদের জন্য ৮২,০০০ টাকা (নির্ধারিত) নির্ধারণ করা হয়েছে ।
নিচে প্রধান কয়েকটি গ্রেডের বেতন পরিবর্তন তুলে ধরা হলো:
-
১ম গ্রেড: ২০০৯ সালের ৪০,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৭৮,০০০ টাকা (নির্ধারিত)।
-
১০ম গ্রেড: ২০০৯ সালের ৮,০০০-১৬,৫৪০ টাকা স্কেলের পরিবর্তে বর্তমানে ১৬,০০০-৩৮,৬৪০ টাকা।
-
২০তম গ্রেড: ২০০৯ সালের ৪,১০০-৭,৭৪০ টাকা স্কেলের পরিবর্তে বর্তমানে ৮,২৫০-২০,০১০ টাকা।
টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বিলুপ্তি এবং উচ্চতর গ্রেড
নতুন এই আদেশের মাধ্যমে পূর্বের প্রচলিত ‘সিলেকশন গ্রেড’ এবং ‘টাইম স্কেল’ ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়েছে । এর পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে:
-
পদোন্নতি ব্যতিরেকে একই পদে ১০ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্ণ হলে ১১তম বছরে কর্মচারী পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাবেন ।
-
পরবর্তী ৬ বছরেও পদোন্নতি না হলে ৭ম বছরে (অর্থাৎ মোট ১৬ বছর পর) তিনি আবারও পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাবেন ।
-
এই সুবিধা শুধুমাত্র বেতনস্কেলের ৪র্থ গ্রেড পর্যন্ত প্রযোজ্য হবে ।
বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট)
জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫-এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির নির্দিষ্ট তারিখ। এখন থেকে সকল কর্মচারীর বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের তারিখ হবে প্রতি বছরের ১ জুলাই । তবে নতুন চাকুরিতে যোগদানকারীদের ক্ষেত্রে অন্তত ৬ মাস কোয়ালিফাইং সার্ভিস পূর্ণ হতে হবে । এছাড়া দক্ষতার সীমা (Efficiency Bar) সংক্রান্ত পূর্বের জটিল বিধানটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে ।
অবসর ও পেনশন সুবিধা
অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের জন্যও নতুন স্কেলে বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে:
-
৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের পেনশনভোগীদের নীট পেনশনের পরিমাণ ৫০% এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে ।
-
সর্বনিম্ন মাসিক পেনশন ৩,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে ।
-
ছুটি নগদায়নের সুবিধা ১৮ মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা আগে কম ছিল ।
শ্রেণি ব্যবস্থার অবসান
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্যে বিদ্যমান ১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির বিভাজন তুলে দিয়ে এখন থেকে বেতনস্কেলের গ্রেড ভিত্তিক পরিচিতি প্রবর্তন করা হয়েছে ।
উপসংহার
জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫ প্রবর্তনের ফলে সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা বাজারমূল্যের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে সহায়ক হবে। যদিও টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বিলুপ্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল, তবে ইনক্রিমেন্টের নতুন নিয়ম এবং উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির সহজীকরণ প্রক্রিয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অধিকতর স্বচ্ছতা আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।

