প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের মাসিক চার্জ প্রত্যাহার : স্বস্তি পেলেও দাম বৃদ্ধিতে জনঅসন্তোষ বহাল
দেশজুড়ে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটার ব্যবহারকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের ওপর আরোপিত মাসিক অতিরিক্ত চার্জ বা মিটার ভাড়া প্রত্যাহার করা হয়েছে। বুধবার (৩ জুন) বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন বিএনপির মিডিয়া সেলের অন্যতম সদস্য শায়রুল কবির খান। একই সঙ্গে বিএনপির মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজেও এ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়।
বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনের জনদুর্ভোগ লাঘব কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর ফলে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারী লাখো গ্রাহক মাসিক অতিরিক্ত আর্থিক চাপ থেকে মুক্তি পাবেন এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যয় কিছুটা কমবে।
দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তবায়ন
প্রিপেইড মিটার চালুর পর থেকেই গ্রাহকদের একটি বড় অংশ মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ এবং বিভিন্ন অতিরিক্ত ফি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, বিদ্যুতের ইউনিটমূল্য পরিশোধের পাশাপাশি প্রতি মাসে আলাদাভাবে মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ আদায় করা হচ্ছে, যা সাধারণ গ্রাহকদের ওপর বাড়তি বোঝা সৃষ্টি করছে।
এর আগে গত ২৯ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের মাসিক ভাড়া বা মিটার চার্জ প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। অবশেষে সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন ঘটল।
কত টাকা সাশ্রয় হবে?
বর্তমানে প্রিপেইড মিটারে প্রতি কিলোওয়াটের জন্য মাসিক ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং সিঙ্গেল ফেজ মিটারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা পর্যন্ত মিটার ভাড়া দিতে হতো। এর সঙ্গে যুক্ত থাকত ৫ শতাংশ ভ্যাট।
ফলে একজন সাধারণ আবাসিক গ্রাহককে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রকৃত বিলের বাইরে অতিরিক্ত উল্লেখযোগ্য অর্থ পরিশোধ করতে হতো। নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এসব চার্জ আর দিতে হবে না, যা গ্রাহকদের মাসিক ব্যয়ে কিছুটা স্বস্তি এনে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বস্তির মাঝেও রয়ে গেছে অসন্তোষ
তবে মিটার ভাড়া প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে জনমনে অসন্তোষ পুরোপুরি দূর হয়নি। সম্প্রতি সরকার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে। ফলে মিটার ভাড়া মওকুফের মাধ্যমে যে আর্থিক সুবিধা গ্রাহকরা পাবেন, তার একটি অংশ মূল্যবৃদ্ধির কারণে কার্যত সমন্বয় হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেক ভোক্তা।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, মিটার ভাড়া প্রত্যাহার অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে বিদ্যুতের সামগ্রিক ব্যয় কমাতে হলে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় চার্জ কমানোর উদ্যোগও নিতে হবে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য
বিশ্লেষকদের মতে, প্রিপেইড মিটারের অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহার সরকারের একটি জনবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতে চাপের সময়ে এমন সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেবে।
তবে একই সঙ্গে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জনগণের প্রত্যাশা আরও বেশি। ফলে শুধুমাত্র মিটার ভাড়া প্রত্যাহার নয়, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদক্ষেপই জনঅসন্তোষ কমানোর মূল চাবিকাঠি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সারসংক্ষেপ
প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের মাসিক ভাড়া ও অতিরিক্ত চার্জ প্রত্যাহারের মাধ্যমে সরকার গ্রাহকদের জন্য একটি দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেছে। এতে লাখো গ্রাহক কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পেলেও বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে জনমনে অসন্তোষ এখনও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ খাতে টেকসই স্বস্তি আনতে আরও ব্যাপক নীতিগত উদ্যোগের দিকে তাকিয়ে আছে সাধারণ মানুষ।

