গেজেটে বিলম্ব, কাটছাঁটের আশঙ্কা: অনিশ্চয়তায় সরকারি চাকরিজীবীরা, নবম পে-স্কেল নিয়ে অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতে পারে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা এবং এ খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দের কথা জানানো হলেও এখনো প্রজ্ঞাপন (গেজেট) প্রকাশ না হওয়ায় দেশের লাখো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। নতুন বেতন কাঠামো চলতি আগস্ট মাসেই গেজেট আকারে প্রকাশ পাবে, নাকি আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে—এ প্রশ্ন এখন সরকারি চাকরিজীবীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সরকার এখনো নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। তবে এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, কত ধাপে কার্যকর হবে এবং জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ কতটুকু গ্রহণ করা হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে।
তিন ধাপ থেকে দুই ধাপ, আবার তিন ধাপের আলোচনা
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী নবম পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের কথা ছিল।
- প্রথম ধাপ: ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর।
- দ্বিতীয় ধাপ: ১ জুলাই ২০২৭ থেকে বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর।
- তৃতীয় ধাপ: ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা চালু।
তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে দেখা যায়, গত কয়েক বছরের নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কারণে অনেক সরকারি কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, কমিশনের প্রস্তাবিত মূল বেতনের মাত্র অর্ধেক কার্যকর করলে প্রকৃত বেতন বৃদ্ধি খুবই সীমিত হবে। এতে বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বেতন বৈষম্য বা অসামঞ্জস্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে একপর্যায়ে দুই ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে সর্বশেষ সচিব কমিটির বৈঠকে আবার তিন ধাপের পরিকল্পনাই গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে। সেখানে প্রথম ধাপে মূল বেতন এবং পরবর্তী ধাপে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা কার্যকর করার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আইএমএফ নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করলেন অর্থমন্ত্রী
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর আপত্তি রয়েছে—এমন আলোচনা চললেও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিষয়টি বাস্তবে তেমন নয়।
গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে নতুন পে-স্কেলের অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলেও আইএমএফের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানানো হয়নি।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই এবং সরকার নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
বাজেটে বড় বরাদ্দ, তবুও কেন অনিশ্চয়তা?
সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এছাড়া জনপ্রশাসন খাতে মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাজেটে বরাদ্দ থাকলেও সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। ফলে রাজস্ব আদায় বা বৈদেশিক অর্থায়নে ঘাটতি দেখা দিলে সরকার ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করতে পারে। সে কারণেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে।
বেতন কমিশনের সুপারিশে কাটছাঁটের ইঙ্গিত
২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার সুপারিশ করেছিল।
সুপারিশে উল্লেখ ছিল—
- সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা।
- সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
- বর্তমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা।
তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ এবং বাজেট ঘাটতির বিষয় বিবেচনায় সরকার কমিশনের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়নের পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন বা কাটছাঁটের বিষয় বিবেচনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আগস্টে গেজেট, নাকি অক্টোবরে?
গেজেট প্রকাশের সময় নিয়ে সরকারি মহল ও চাকরিজীবীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা চলছে।
একটি সূত্রের দাবি, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হলে চলতি আগস্ট মাসেই প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। অন্যদিকে আরেকটি সূত্রের মতে, সচিব কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ, অর্থ বিভাগের অনুমোদন এবং সফটওয়্যার প্রস্তুতিসহ সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অক্টোবরের আগে গেজেট প্রকাশ কঠিন হতে পারে।
তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল জানিয়েছে, গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলেও নতুন পে-স্কেল ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকেই কার্যকর বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ, গেজেট প্রকাশের পর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার্যকারিতার তারিখ থেকে প্রাপ্য বকেয়া বেতন-ভাতাও পাবেন।
প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিও বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কেবল অর্থের সংস্থানই নয়, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশনসহ আর্থিক কার্যক্রম ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (EFT) এবং iBAS++ সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ধাপে ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করতে গেলে সফটওয়্যারের বেতন গণনা, ইনক্রিমেন্ট, ভাতা ও পেনশন মডিউলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। এজন্য প্রয়োজন হবে নতুন প্রোগ্রামিং, পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এবং কারিগরি সমন্বয়ের।
কর্মচারীদের প্রত্যাশা
মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে নতুন পে-স্কেলের অপেক্ষায় থাকা চাকরিজীবীরা দ্রুত গেজেট প্রকাশ করে অনিশ্চয়তার অবসান চান।
তাদের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে গেজেট প্রকাশ করবে, যাতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে এবং নতুন বেতন কাঠামোর সুফল বাস্তবে পাওয়া যায়।
সারসংক্ষেপ
নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত বহাল থাকলেও বাস্তবায়নের ধাপ, কমিশনের সুপারিশে সম্ভাব্য পরিবর্তন, বাজেটের চাপ এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির কারণে গেজেট প্রকাশ বিলম্বিত হচ্ছে। আগস্টে গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও এখনো সরকারিভাবে কোনো তারিখ ঘোষণা হয়নি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—গেজেট যত দেরিতেই প্রকাশ হোক, সরকার ১ জুলাই ২০২৬ থেকেই নতুন পে-স্কেলের কার্যকারিতা বহাল রাখার নীতিতে অটল রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এখন একমাত্র অপেক্ষা চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের।

