চূড়ান্ত পর্যায়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল, আগামী সপ্তাহেই মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে প্রস্তাব
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আবারও গতি এসেছে। নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহে অথবা চলতি আগস্টের শেষ দিকে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এমন তথ্য জানিয়েছে একাধিক সংবাদমাধ্যম।
মন্ত্রিসভায় প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে পরবর্তী ধাপে প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তবে নতুন পে-স্কেল ঠিক কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হলেও প্রজ্ঞাপন প্রকাশ ও কার্যকর হওয়ার নির্দিষ্ট তারিখকে এখনই চূড়ান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
পে-স্কেলের প্রস্তাব কী
নবম জাতীয় পে কমিশনের সুপারিশে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড কাঠামো বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে মূল বেতন ১০০ শতাংশের বেশি থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বেতন কাঠামোর লক্ষ্য শুধু বেতন বাড়ানো নয়; সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বর্তমান বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদন ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল—তাই প্রতিবেদনের সময়কাল নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন প্রতিবেদনে যে অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
বিশেষ কমিটির পর্যালোচনা
পে কমিশনের সুপারিশ পাওয়ার পর বিষয়টি সরাসরি বাস্তবায়ন না করে আরও পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে পে-স্কেলের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছিল। ওই কমিটির পর্যালোচনা ও সুপারিশের ভিত্তিতেই নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, প্রস্তাবটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের পর্যালোচনায় রয়েছে। ফলে মন্ত্রিসভায় এটি উপস্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
বড় চ্যালেঞ্জ আর্থিক চাপ
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এর আর্থিক প্রভাব। বেতন কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে সরকারের নিয়মিত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়তে পারে মূল্যস্ফীতি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।
এ কারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল—আইএমএফের পক্ষ থেকেও পে-স্কেল বাস্তবায়ন কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরকার পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত করার পরিবর্তে দেশের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়নের পথ খুঁজছে। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
বাড়বে সরকারি ব্যয়, প্রয়োজন রাজস্ব সক্ষমতা
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। অতিরিক্ত এই ব্যয় সামাল দিতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো প্রয়োজন হবে।
বিশেষ করে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে পেনশন, বিভিন্ন ভাতা এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধার ওপরও আর্থিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। ফলে শুধু নতুন মূল বেতন নির্ধারণ নয়, পুরো সরকারি বেতন-ভাতা ব্যবস্থার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর কী হবে
নতুন পে-স্কেলের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব উপস্থাপন ও অনুমোদন। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো পরবর্তী প্রশাসনিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পারবে এবং প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তবে অনুমোদনের পরই যে সঙ্গে সঙ্গে নতুন বেতন হাতে পাওয়া যাবে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বাস্তবায়নের তারিখ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও হিসাব ব্যবস্থার সমন্বয়ের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি চাকরিজীবীদের নজর এখন মন্ত্রিসভার দিকে
২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর দীর্ঘ সময় নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো আসেনি। এর মধ্যে নিয়মিত বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি হলেও মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নবম পে-স্কেল নিয়ে প্রত্যাশা ক্রমেই বেড়েছে।
বর্তমানে প্রস্তাবটি চূড়ান্ত পর্যালোচনার পর্যায়ে থাকায় আগামী সপ্তাহ কিংবা আগস্টের শেষ দিকে মন্ত্রিসভায় এটি উঠতে পারে—এমন সম্ভাবনাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। তবে এটি এখনো সম্ভাব্য সময়সূচি, চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত নয়। মন্ত্রিসভার অনুমোদন, প্রজ্ঞাপন প্রকাশ এবং কার্যকর হওয়ার তারিখ—প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পরই নবম জাতীয় পে-স্কেলের চূড়ান্ত রূপ স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল এখন গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। মন্ত্রিসভায় প্রস্তাবটি কবে উঠছে, কী পরিবর্তনসহ অনুমোদিত হচ্ছে এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা কী নির্ধারণ করা হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তরেই নির্ভর করছে লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বহুল প্রত্যাশিত নতুন বেতন কাঠামোর পরবর্তী অধ্যায়।

