৯ম পে স্কেল নিউজ

নতুন পে-স্কেল চূড়ান্ত, যেকোনো সময় ঘোষণা: প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব

সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে বড় বার্তা; মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার সমন্বয়ের কথা জানালেন তিনি

দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। যেকোনো সময় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার। রোববার (১৬ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।

নতুন পে-স্কেল নিয়ে মুখ্য সচিবের এই বক্তব্য সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে একই বেতন কাঠামোর মধ্যে কাজ করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টি এখন কার্যকর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।

১১ বছর পরও মূল্যস্ফীতির চাপ

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে নতুন পে-স্কেল না হওয়ায় দেশের প্রায় ১৮ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছেন। সময়ের সঙ্গে খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে পুরোনো বেতন কাঠামোর সঙ্গে বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, জনগণের জন্য বিষয়টি কষ্টকর হলেও সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার সঙ্গে বেতন-ভাতার সমন্বয় করা প্রয়োজন।

এর মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—নতুন পে-স্কেলের বিষয়টি শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রশ্ন হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক সক্ষমতার সামঞ্জস্য তৈরির বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।

পে-স্কেল নিয়ে আগে থেকেই ছিল সরকারি উদ্যোগ

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে চলতি বছরের বাজেটেও সরকার আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

এর আগে বিভিন্ন সরকারি পর্যায়ের আলোচনায় নতুন বেতন কাঠামো কয়েক ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথাও এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রথম ধাপে নতুন বেসিকের একটি অংশ কার্যকর এবং পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট অংশ ও ভাতা বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে রোববারের মুখ্য সচিবের বক্তব্যকে নতুন করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ঘোষণার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বাস্তবায়নের কাঠামো

পে-স্কেল চূড়ান্ত হওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবচেয়ে বড় আগ্রহ থাকবে—কত শতাংশ বেতন বাড়বে, কোন গ্রেডে কত টাকা হবে, কোন তারিখ থেকে কার্যকর ধরা হবে, কীভাবে বকেয়া পরিশোধ করা হবে এবং ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হবে।

আগের বিভিন্ন সরকারি আলোচনা ও সংবাদ প্রতিবেদনে নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

এ কারণে শুধু ‘পে-স্কেল চূড়ান্ত’ ঘোষণা নয়, এর সঙ্গে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে মূল বেতন, গ্রেডভিত্তিক কাঠামো, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, টিফিন, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং বকেয়া পাওনার নিয়ম—এসব বিষয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি

পে-স্কেলের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব। তিনি বলেন, সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থনীতি। এই সংকট মোকাবিলায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। কারণ নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে শুধু মূল বেতন নয়, এর সঙ্গে পেনশন, বিভিন্ন ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে প্রশাসনের কর্মদক্ষতা ও জীবনযাত্রার ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই সরকারের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—একদিকে কর্মচারীদের ন্যায্য আর্থিক সমন্বয়, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রিত চাপ।

জ্বালানি সংকটেও বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থার উদ্যোগ

দেশের বর্তমান গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন মুখ্য সচিব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং আগের সরকারের বিকল্প ব্যবস্থা না রাখার কারণে বর্তমান জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহে একটি মাত্র উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাশিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও চীন থেকে বহুমুখী সাপ্লাই চেইন তৈরির চেষ্টা করছে সরকার।

এর অর্থ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো একটি অঞ্চল বা সরবরাহকারী সংকটে পড়লে যাতে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য বিকল্প উৎস তৈরি করতে চায় সরকার। দীর্ঘমেয়াদে এটি জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হতে পারে।

পে-স্কেল ও অর্থনীতি—দুই দিকেই ভারসাম্যের পরীক্ষা

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে মূলত দুটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করবে। প্রথমত, দীর্ঘ ১১ বছরের বেতন কাঠামোগত স্থবিরতা কাটিয়ে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয় সমন্বয় করা। দ্বিতীয়ত, বাড়তি বেতন ও ভাতার কারণে সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের ওপর যে চাপ তৈরি হবে, তা সামলানো।

বাজেট-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ কারণে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে একসঙ্গে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ তুলনামূলকভাবে কমতে পারে।

মন্ত্রিসভায় রদবদল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

এদিকে মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদলের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বলেন, এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

অর্থাৎ মন্ত্রিসভায় কে থাকবেন, কে বাদ পড়বেন কিংবা কোন মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসবে—এসব সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার চেয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। ফলে এ বিষয়ে কোনো প্রশাসনিক পর্যায়ের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এখন নজর প্রজ্ঞাপনের দিকে

সব মিলিয়ে রোববারের বক্তব্যে নতুন পে-স্কেল নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—প্রক্রিয়াটি আর প্রাথমিক আলোচনা বা প্রস্তাবের পর্যায়ে নেই; বরং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রকৃত স্বস্তি আসবে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরই। কারণ ঘোষণার মাধ্যমে শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত জানা যাবে, কিন্তু প্রকৃত সুবিধা নির্ধারিত হবে প্রজ্ঞাপনে থাকা গ্রেডভিত্তিক বেতন, ভাতা, কার্যকর তারিখ, বাস্তবায়নের ধাপ এবং বকেয়া পরিশোধের নিয়মের মাধ্যমে।

২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় নতুন কাঠামো নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।

তাই এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল প্রশ্ন একটাই—চূড়ান্ত পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন কবে প্রকাশ হবে এবং সেখানে তাদের প্রত্যাশার কতটা প্রতিফলন ঘটবে?

মুখ্য সচিবের ‘যেকোনো সময় ঘোষণা’ বক্তব্য সেই অপেক্ষাকে আরও তীব্র করেছে। এখন পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ এবং বাস্তবায়ন নির্দেশনার দিকেই থাকবে সরকারি চাকরিজীবীদের নজর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *