bd Service Rules

৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীরও কি এসিআর বাধ্যতামূলক? চাকরির শেষে একবার করলেই হবে—কতটা যৌক্তিক

সরকারি চাকরিতে প্রচলিত পুরোনো ‘১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণি’ বিভাজনের পরিবর্তে বর্তমানে মূলত গ্রেডভিত্তিক কাঠামো ব্যবহৃত হচ্ছে। এ অবস্থায় অনেক কর্মচারীর মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের কি বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন বা এসিআর (ACR) প্রয়োজন? নাকি শুধু সার্ভিস বই থাকলেই যথেষ্ট?

এ নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। একজন কর্মকর্তা যদি বলেন, প্রতিবছর এসিআর করার প্রয়োজন নেই, চাকরির শেষে একবার করলেই হবে—তাহলে সেই বক্তব্য কতটা আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

সরকারি নথি ও বিদ্যমান অনুশাসনমালা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিষয়টি শুধু সার্ভিস বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরাও এসিআরের আওতায়

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘১০ম-২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য গোপনীয় অনুবেদন অনুশাসনমালা-২০২৩’ অনুযায়ী সরকারি, আধা-সরকারি, সংযুক্ত দপ্তর, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত ও বিধিবদ্ধ সংস্থা, কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন কমিশন এবং অসামরিক প্রশাসনে নিয়োজিত ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীরা এই ব্যবস্থার আওতাভুক্ত।

অর্থাৎ, পুরোনো ভাষায় যাদের অনেকেই ‘৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং বর্তমানে যারা সাধারণত ১৭-২০তম গ্রেডে কর্মরত, তাদের ক্ষেত্রেও গোপনীয় অনুবেদনের বিধান রয়েছে।

বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটেও ১৭-২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য পৃথক এসিআর ফরম প্রকাশ করা হয়েছে। কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্সের কার্যালয়ের প্রকাশিত তালিকায় ১৭-২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য পৃথক গোপনীয় অনুবেদন ফরমের উল্লেখ রয়েছে।

তাহলে কি সার্ভিস বই থাকলেই যথেষ্ট?

না, সার্ভিস বই ও এসিআর এক জিনিস নয়।

সার্ভিস বইয়ে একজন কর্মচারীর চাকরিজীবনের বিভিন্ন প্রশাসনিক তথ্য সংরক্ষিত থাকে। যেমন—

  • নিয়োগের তথ্য;
  • যোগদানের তারিখ;
  • পদ ও বেতনসংক্রান্ত তথ্য;
  • ছুটি;
  • পদোন্নতি বা অন্যান্য চাকরিসংক্রান্ত আদেশ;
  • চাকরির মেয়াদসহ গুরুত্বপূর্ণ সার্ভিস রেকর্ড।

অন্যদিকে, এসিআর হলো কর্মচারীর নির্দিষ্ট সময়ের কর্মমূল্যায়নসংক্রান্ত গোপনীয় নথি। সরকারি নির্দেশনার ভাষায়, অনুবেদনকারী ও প্রতিস্বাক্ষরকারী কর্তৃপক্ষ কর্মচারীর কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন করে গোপনীয় অনুবেদন সম্পন্ন করেন।

তাই সার্ভিস বই থাকলেও সেটি এসিআরের বিকল্প—এমনটি সাধারণভাবে বলা যায় না।

প্রতিবছর এসিআর করতে হয় কি?

এসিআরের মূল ধারণাই হলো বার্ষিক কর্মমূল্যায়ন। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সাম্প্রতিক নির্দেশনা ও ফরম ব্যবস্থাপনায়ও গ্রেডভিত্তিক বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনের ব্যবস্থা দেখা যায়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের প্রকাশিত নির্দেশনায় ৯ম ও তদূর্ধ্ব, ১০-১২তম, ১৩-১৬তম এবং ১৭-২০তম গ্রেডের জন্য পৃথক এসিআর ফরমের ব্যবস্থা রয়েছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায়ও ২০২৩ সালের অনুশাসনমালা অনুযায়ী ১০-২০তম গ্রেডভুক্ত, গাড়িচালকসহ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর গোপনীয় অনুবেদন দাখিল, অনুস্বাক্ষর, প্রতিস্বাক্ষর ও ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে।

সুতরাং, কর্মচারীর পুরো চাকরিজীবনের কর্মদক্ষতা একদিনে বা চাকরির একেবারে শেষে বসে মূল্যায়ন করার ধারণা বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

চাকরির শেষে একবার এসিআর করলেই হবে—এ বক্তব্য কতটা যৌক্তিক?

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এ ধরনের বক্তব্য সাধারণ নিয়ম হিসেবে গ্রহণযোগ্য বা নিরাপদ ব্যাখ্যা নয়

কারণ, এসিআর মূলত নির্দিষ্ট সময়ের কর্মসম্পাদন, আচরণ, দায়িত্ব পালনের মান এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় মূল্যায়নের জন্য করা হয়। কয়েক বছর বা কয়েক দশকের চাকরিজীবনের মূল্যায়ন শেষে একবারে তৈরি করলে—

১. প্রতি বছরের প্রকৃত কর্মদক্ষতা আলাদাভাবে মূল্যায়নের সুযোগ কমে যায়;

২. তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত অনুবেদনকারী কর্মকর্তার পর্যবেক্ষণ পাওয়া কঠিন হতে পারে;

৩. পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড বা অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় রেকর্ডের ঘাটতি তৈরি হতে পারে;

৪. পরবর্তীতে নথি যাচাইয়ের সময় জটিলতা দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে চাকরির অনেক বছর পর একজন কর্মকর্তা কর্মচারীর বহু বছরের বাস্তব কর্মসম্পাদন সম্পর্কে নির্ভুল মূল্যায়ন দিতে পারবেন কি না—সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এসিআর না থাকলে কি বিভাগীয় মামলা হবেই?

এখানে একটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বলা প্রয়োজন।

এসিআর দাখিল বা ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভাগীয় মামলা হবে—এমন সরল সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, দায়িত্বে অবহেলা এবং নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর।

তবে সরকারি নথিপত্র যথাসময়ে ও যথানিয়মে সম্পন্ন ও সংরক্ষণ করা প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে এসিআর যথাসময়ে দাখিল, অনুস্বাক্ষর, প্রতিস্বাক্ষর এবং যথাযথ সংরক্ষণসংক্রান্ত পৃথক নির্দেশনারও উল্লেখ রয়েছে।

‘৪র্থ শ্রেণি’ নয়, এখন গ্রেডের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

প্রশ্নটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বর্তমানে বিষয়টি শুধু ‘৪র্থ শ্রেণি’ হিসেবে দেখার সুযোগ কমে এসেছে। কর্মচারী কোন গ্রেডে কর্মরত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান এবং তার জন্য কোন অনুশাসনমালা প্রযোজ্য—এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

সরকারি নথিতে ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের জন্য পৃথক গোপনীয় অনুবেদন অনুশাসনমালা এবং ১০ম-২০তম গ্রেডের জন্য পৃথক অনুশাসনমালার উল্লেখ পাওয়া যায়।

কী করবেন কর্মচারীরা?

যদি কোনো দপ্তরে ১৭-২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের এসিআর করা না হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের উচিত—

  • নিজ দপ্তরের প্রশাসন বা সংস্থাপন শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করা;
  • এসিআর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে লিখিত বা অফিসিয়াল নির্দেশনা জানা;
  • সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিধি বা বিশেষ নির্দেশনা আছে কি না তা যাচাই করা;
  • প্রয়োজন হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রযোজ্য অনুশাসনমালা অনুসরণ করা।

শেষ কথা

৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী বলে এসিআরের প্রয়োজন নেই—এ ধারণা বর্তমান গ্রেডভিত্তিক এসিআর ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিদ্যমান সরকারি অনুশাসনমালার আওতায় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের জন্য গোপনীয় অনুবেদনের ব্যবস্থা রয়েছে।

আর ‘প্রতিবছর এসিআর লাগবে না, চাকরির শেষে একবার নিলেই হবে’—এ বক্তব্যও সাধারণ নিয়ম হিসেবে যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয় না। কারণ এসিআরের উদ্দেশ্যই হলো চাকরিজীবনের নির্দিষ্ট সময়ের কর্মমূল্যায়ন যথাসময়ে নথিভুক্ত করা।

তবে কোনো নির্দিষ্ট কর্মচারীর ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তার দপ্তর, গ্রেড, চাকরির ধরন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রযোজ্য বিধি বা বিশেষ নির্দেশনা অবশ্যই যাচাই করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *